সুরঞ্জন মণ্ডলের চোখে কবি সুকান্ত ও বর্তমান সময় :~
.
সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা সাহিত্যে মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী একজন কবি। মার্কসবাদ কথার অর্থ হল সাম্যবাদ। মালিক বা বুর্জোয়া শ্রেনীর সাথে শোষিত, নিপীড়িত শ্রমিক শ্রেণীকে একসারিতে বসানোর মতবাদ হল সাম্যবাদ।
.
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট। তিনি তার সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির প্রভাব স্বচক্ষে দেখেছেন আর হিংসার বিরুদ্ধে তার কলম গর্জে উঠেছে বার বার। প্রতিবাদী অগ্নিপিণ্ডের মত আছড়ে পড়েছে একের পর এক প্রতিবাদী কবিতা। প্রার্থী, হে মহাজীবন, একটি মোরগের কাহিনী, দুরাশার মৃত্যু, ছাড়পত্র প্রভিতি লেখনিতে তার ছাপ আমরা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই।
.
বুর্জোয়া শ্রেণী তখন যেমন ছিল এখনও তেমন ভাবেই বিদ্যমান। রাজনৈতিক দলের মতো তাদেরও রঙ বদলেছে মাত্র। আজ ২০১৫ সালে পঁচে যাওয়া এক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা কি তার গন্ধ পাইনা? নাকি প্রতিবাদের ভাষা আমরা একটু একটু করে ভুলতে বসেছি? নাকি আধুনিকতার ঠেলায় বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ির আড়ালে জঞ্জালের স্তুপের মত অন্ধকার বস্তি গুলোকে আর নজরে পরে না? কবি সুকান্ত হয়ত গন্ধটা পেয়েছিলেন। আর ক্রমশ ঘনিভুত হতে থাকা অন্ধকার তার নজরে পড়েছিল। সেই জন্যই হয়ত একফালি আলোর খোঁজ করছিলেন। নইলে কেন বলবেন-
.
হে সুর্য!
তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও,
আর উত্তাপ দিও,
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
.
হে সূর্য
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও
শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড,
তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে
পরিণত হব!
তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা,
তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী।।
.
আমরা ক্রমশ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাচ্ছি। অথবা স্বার্থান্বেষী হয়ে নিজের স্বপ্ন নিয়ে এতটাই মজগুল হয়ে পড়েছি যে ভুলে যাচ্ছি ছেড়া কাঁথায় শুয়েও স্বপ্ন দেখা যায়। সুকান্ত কিন্তু অন্য স্বপ্ন দেখতেন। শোষণ বিহীন এক নতুন বিশ্বের স্বপ্ন। এক প্রতিবাদী জনতার বিশ্ব। যেখানে একটা শিশু জন্ম মুহুর্ত থেকে প্রতিবাদ জানাবে-
.
খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা তেতাল্লিশের মম্বন্তরের রেশ এখন আর নেই। এখন যা রেয়েছে তা চোখে দেখা যায় না। আমার বোনের ছিড়ে খাওয়া লাশ যেদিন এঁদো গলিতে পড়ে থাকবে সেদিন সমস্যা নজরে পড়বে। নইলে প্রতিদিন সকালে গরম চায়ের সাথে দৈনিক সংবাদ পত্রের পাতা উল্টাব আর খুন, ধর্ষণ আর শাসক দলের বেফাঁস মন্তব্য আয়েশ করে গিলব।
.
আজকের দিনে প্রতিবাদ করতে সেখাটা ভীষণ ভাবে দরকার। দরকার একজন কবি সুকান্তের। দরকার একটা গর্জে উঠা প্রতিবাদী কলমের। আর কবিতার স্নিগ্ধতা নয়, চাই কঠিন কঠোর গদ্য।
.
আমি রাজনীতি বুঝিনা, বুঝতে চাইও না। তবে যখন এক থালা ভাতের জন্য আমার পেট খিদেতে চোঁচোঁ করে, তখন তার যন্ত্রণা ভীষণ ভাবে অনুভব করি। ওই অট্টালিকা নয়, এক থালা ভাত আর একটু সম্মানের সন্ধান করি প্রতিনিয়ত। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দুর্গাপুজোর ধুমধাম করে ভোট হয়। আমরা সেজেগুজে ভোট দিতে যাই। শাসক দলের রঙ বদলায়। কিন্তু আমি আমার সম্মানের সন্ধান পাইনা। “গরীবের সম্মান” কথাটিই এখন সোনার পাথরবাটি।
.
আমার সম্পদ বলতে ভাঙাচোরা এই শরীর। আর গায়ের রং? লাল নয়, গেরুয়া নয়, সবুজও নয়; সেরফ রোদে পুড়ে কালো। কালো রঙের কোন ব্র্যান্ড ভ্যালু নেই। তাই আমার গুরুত্ব কেউ দেয় না। তবুও আমি কালোকেই ভালোবাসি।
.
আমার পেটে এখন এক শতাব্দীর খিদে। পুর্নিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি ছাড়া কিছু নয়। না, আমি রঙ বদলাতে রাজি নই। কেউকি আমায় একটুকরো রুটি এনে দিতে পারো?
লওণ্ডা নাচ নিয়ে কিছু কথাঃ
কাল রাতে ‘সাবধান ইনডিয়া ইউ . পি. ফাইটস ব্যাক’ –এর একটি পর্বে দেখছিলাম ‘লওণ্ডা নাচ’ নামক পেশাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনার ব্যাপারে।
ছোট গল্প। ভানু নামের একটি ছেলে সদ্য সাবালক হবার পরে বাড়ির অভাবের তাড়নায় ‘নাচনিয়া’ (পুরুষ হয়েও মেয়েলি পোশাকের অন্তরালে থেকে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে অশ্রাব্য গানের তালে তালে নাচে যে) পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, প্রসঙ্গত উল্লেখ্য তার পিতাও এই পেশায় লিপ্ত ছিলেন। পিতাকে জোর করে রাজি করিয়ে এবং মাকে লুকিয়ে ছেলেটি খুব অল্প দিনের মধ্যেই লওণ্ডা নাচিয়ে হিসাবে বেশ নাম করে (ভানু হয়ে যায় ভানুপ্রিয়া) এবং ভালো টাকা রোজগার করতে থাকে। কিন্তু জীবন সোজা পথে এগোয় না। ডাক পড়ে এক স্থানীয় মুরুব্বির মেয়ের বিয়েতে নাচার জন্য। সেখানে নাচার সময় ছেলেপক্ষের একজনের নেকনজরে (!!!) পড়ে যায় ভানুপ্রিয়া, তাকে ৫০,০০০ টাকার নগদ ইনাম দেওয়া হয়। কিন্তু ইনাম প্রদানকারী কমবয়সী ছেলেটি বুঝে উঠতে পারেনা যে ভানুপ্রিয়া মেয়ে নয় ছেলে (এতই ভালো ছিল ভানুপ্রিয়ার অভিনয় আর নাচের দক্ষতা)। মেয়ে পক্ষের কিছু মানুষ ইনাম প্রদানকারী ছেলেটির সাথে কদর্য রসিকতার তালে ভানুপ্রিয়া’কে তুলে আনে রাতে ছেলেটির ঘরে (তাতে সাহায্য করে ভানুপ্রিয়ার নাচনিয়া দলের এক পুরানো নাচনিয়া, যে ভানুপ্রিয়ার ক্রমোন্নতি দেখে জ্বলে যাচ্ছিল)। ইনাম প্রদানকারী ভানুপ্রিয়া’কে বলাৎকার করতে গেলে প্রকাশিত হয়ে পড়ে ভানুপ্রিয়া আসলে ভানু। ভানু সেই মুহূর্তে পালিয়ে গেলেও ছেলে পক্ষের ইজ্জৎ নিয়ে মেয়ে পক্ষের মানুষ ‘খেলা’ করায় তার মাসুল দিতে হয় ভানুর প্রাণ দিয়ে। পরে এই গল্পে (সত্য ঘটনা) পুলিশের সাহায্য নিয়ে অপরাধী ধরা পড়ে।
ওপরের যে কাহিনী বিবৃত করলাম এরকম রোজকার জীবনে ঘটে থাকে ভারতীয় গো – বলয় এর Eastern U.P. , Bihar ইত্যাদি অঞ্চলে। লওণ্ডা নাচ এখানে খুব সাধারণ ব্যাপার। প্রায় মাস ছয়েক আগে থেকে এই নিয়ে পড়া, তথ্য খোঁজার কাজ শুরু করেছিলাম, কিছু পেয়েওছি। কি অদ্ভুত জীবন এদের সেটা না পড়লে, না দেখলে বোঝা যাবে না। মনে হয় আমরা শুয়ে আছি, না ঘুমানোর কথা বলিনি, বললাম শুয়ে আছি। যে অর্থে শুয়ে থাকা তা হল নিজেদের গা বাঁচানো, যেমন মানুষ বাঁচায় বোমার আঘাত, গুলির আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে, আমরা জেনেও চুপ করে থাকি।
সামান্য কিছু অর্থের চাহিদায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অন্ধ্র, ওড়িশা থেকে কম বয়সী ছেলেরা উপরোক্ত অঞ্চলে ভিড় জমায় ‘নাচনিয়া’ হবার তাগিদে। এর মধ্যে প্রভেদ থাকে; কেউ শুধুই টাকার জন্য মেয়ের পোশাকে নাচে, কেউ মেয়েলি স্বভাবের তাই এই পেশা বেছে নেশার সাথে মিশিয়ে নেয়, অনেকে আবার নিজের লিঙ্গ কর্তন (লিকম ছিবড়ানো, লিকম= লিঙ্গ) করিয়ে হিজড়াদের খোলিতে নাম লিখিয়ে এই পেশায় আসে।
ভারতীয় গো – বলয় এর Eastern U.P. , Bihar ইত্যাদি অঞ্চলে বিয়ের বরযাত্রী বা ‘বারাতি’ এলে তাঁদের নেচে ‘স্বোয়াগত’ করতে / ‘বারাতি’র দলের সামনে নেচে নেচে আসার জন্য লওণ্ডা নাচিয়েদের দরকার হয়। ইতিহাস বলছে প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই প্রথার প্রচলন। মেয়েদের পর্দানশীন হবার কারণে ছেলেরাই এই পেশায় নাম লেখায়, তাছাড়াও মূলস্রোত ব্যতীত হিজড়া সমাজের মানুষ এতে অংশ নেন।
নাচ চলতে থাকে, রাত বাড়তে থাকে। মদের ফোয়ারার ছটকানিতে বারাতির দল ভুলে যায় নাচনিয়াদের লিঙ্গ (অবশ্য বিকৃত কাম লিঙ্গ ভেদ দিয়ে বিচার করা মূর্খের কাজ, যে বিকৃত কামের অধিকারী সেই ব্যক্তি সমাজের গায়ে একটা ঘা’য়ের মতই, নারী জাতির অবমাননাকারী প্রত্যেক মানুষ এই বিকৃত কামের অধিকারী ) , তাদের নিয়ে টানাটানি বাড়তে থাকে, নাচের রঙ্গে নেশা ধরাতে নাচনিয়ার দল যে পিঠের বেশি ভাগ খোলা ‘চোলি’ পড়ে থাকে সেই উম্মুক্ত পিঠে পড়তে থাকে পুরুষের হাত, ‘বন্ডেজ’প্রিয় বারাতির ব্লেড ছিন্ন ভিন্ন করে নাচনিয়া লওণ্ডার দেহ, রক্তে – স্বেদে দুর্দমনীয় পৌরুষ এর পরে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায় লওণ্ডা নাচের নায়িকাদের (নায়ক!!!)। এক নয়, দুই নয় বেশি ভাগ ক্ষেত্রে ১২-১৪ জনের হাতে ধর্ষিত হতে হয়েছে বলেই গড়পড়তা হিসাব মেলে।
তবে শুধু বারাতির বরাত নিয়ে নাচা নয়, কিছু ক্ষেত্রে মেলায়, অনুষ্ঠানে নাচার জন্যেও নাচনিয়াদের ব্যবস্থা করা হয়। নাচনিয়া খোলির মালিক এসব ব্যাপার দেখে থাকেন। আবার অনেক সময় রহিস জমিনদার দের বাড়িতে পাকাপাকি নাচনিয়াকে ক্রীতদাসের (ক্রীতদাসী!!!) মত রাখা হয়। ক্রীতদাস বলা বোধ হয় ভুল হবে, বলা যেতে পারে যৌনদাস হিসাবে। সেখানে কিছুটা খেতে পাবার জন্য বার বার তাকে ধর্ষিত হতে হয় জমিনদার, তার পরিজন, চাকর এদের হাতে; এমনকি প্রাতক্রিয়া সারতে মাঠে গেলেও শিকার হতে হয় এদের। কি অদ্ভুত লাগছে না! তার থেকেও বেশি গা – শিউরে ওঠা ভাব আসছে না! কিন্তু কিছু করার নেই লওণ্ডা নাচের নায়ক (!!!)দের। শেষ অব্দি বেশি ভাগ ক্ষেত্রে কোন দুরারোগ্য যৌন ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্থান হয় রাস্তার ধারে, জীবনের শেষের ওখানেই শুরু হয়।
ঋণস্বীকারঃ
১. গুরুচণ্ডালী ওয়েবম্যাগ
২. ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার ১৪২১ শারদ সংখ্যা
৩. ইন্টারনেট থেকে নানা সংকলিত তথ্য
৪. নিজস্ব গদাসম দৃষ্টিভঙ্গী