Showing posts with label ChotoGolpo(ছোটগল্প ). Show all posts
Showing posts with label ChotoGolpo(ছোটগল্প ). Show all posts

Tuesday, 7 July 2015

ছোটগল্প - কবি -স্পর্শের বাইরে ~


**কবি**
    -স্পর্শের বাইরে



(লেখাটি উত্সর্গ করলাম সেই সব কবি'দের,যাদের কবিতা কখনও মলাটবন্দি হয়নি,,হয়ত কখনও হবে না)

"আপনি এখনও বসে আছেন?"
ভদ্রলোক যঠেষ্ট বিরক্ত বোধ করলেন,এবং তা লুকানোর চেষ্টা করলেন। অনুভূতি লুকানো যায়না। বিরক্তি লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টায় ভদ্রলোকের মুখ দেখাচ্ছে ছুঁচোর মত। আমি হাসিহাসি মুখে ভদ্রলোকের সামনে কি দাড়ালাম,তারপর হাত জোড় করে বললাম
"ভালো আছেন বিনোদন বাবু? শরীর কেমন?"
ভদ্রলোক এবার আক্ষরিক অর্থেই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন এবং আবার আগের মতন তা লুকানোর চেষ্টা করে বললেন-
"স্পর্শবাবু,শুনুন একটা কথা বলি। আগে আপনি বসুন,..বসুন,তারপর বলছি।"
আমি বসলাম।
"আপনি একজন কবি মানুষ। কবিদের প্রত্যেকটি ভাষা-শব্দ হবে নিখুঁত। তাই না? নয়ত সাধারণ মানুষের শব্দচয়ন আর কবিদের মধ্যে পার্থক্য কি থাকল? কাল থেকে যেকোন হকারও কবিতা বলে জিনিস বিক্রি করতে শুরু করবে। তাই না?"
-" সে তো অবশ্যই।"
- "তাই আপনাকে আবারও বলছি,আমার নাম বিনোদন নয়,,বিনয়ন। বিনয়ন সামন্ত। বুঝতে পেরেছেন??"
- "হ্যাঁ। বড় ভালো নাম।"
-" ধন্যবাদ। এবার বলুন আমি আপনার জন্য কি করতে পারি?? যদি আবার সেই পুরনো অনুরোধ থাকে,তবে আমাকে মাফ করবেন।"
-" আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি সেই পুরনো অনুরোধই আপনার কাছে আবার করতে এসেছি। যদি আমার কবিতাগুচ্ছ মলাটবদ্ধ করেন।"
-" সম্ভব নয় স্পর্শবাবু"।
-"কেন সম্ভব নয়? আমার কবিতাগুলি কি আপনার পছন্দ নয়? সত্যিকারের বলুন তো!"
-"অবশ্যই পছন্দ"
-"তবে?"
-"অনেক ব্যাপার থাকে স্পর্শবাবু। আপনি তা বুঝবেন না। আর আমি আপনাকে তা বোঝাতেও চাই না। সেটাই আপনার এবং আমার জন্য মঙ্গল।"
-"সামন্তবাবু,আপনি নিজেও জানেন আমি একজন সম্ভাবনাময় কবি। শুধু একটা স্কোপ চাই।"
-" জানি ভাই। আপনি অবশ্যই একজন সম্ভাবনাময় কবি। কিন্তু দু:খের বিষয় আমি আপনাকে স্কোপ দিতে পারব না। পশ্চিমবঙ্গের রাস্তাঘাটে এরকম হাজারো সম্ভাবনাময় কবিদের খুঁজে পাবেন। ওত কষ্ট করতে হবে না। বিভিন্ন সোশাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোতেই যান না,লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতীতের স্টাটাস ঘেঁটে দেখুন,লক্ষ লক্ষ কবিতা খুঁজে পাবেন। তাদের সবাইকে স্কোপ দিতে গেলে আমরা আর ব্যবসা চালাতে পারব না। আসলে তো ব্যবসাই করি তাই না! আমাদেরও বউ-ছেলেমেয়েদের খাওয়াতে হয়।"
-" সামন্তবাবু আপনি জানেন যে আমার পাঠক আছে,যারা আমার কবিতা পড়ে। আপনারা দু-একটা চিঠিও পেয়েছেন। আপনাদের বিভিন্ন পুজো সংখ্যাগুলোর একটা-দুটোতে আমার কবিতা বের হয়। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ঘাটলেও আমার কবিতা পাবেন।"
-" আরে ধুর! আপনি এটাকে উনবিংশ শতাব্দি ভেবেছেন নাকি? লিটল ম্যাগাজিন এখন লক্ষ লক্ষ পাবেন। সেগুলোর আর পাঠক তৈরির ক্ষমতা নেই। সরি,একটু ভুল বললাম,,কবিতার পাঠক তৈরির ক্ষমতা নেই। এখন সবাই উপন্যাস খোঁজে ভাই। কোন বার্ষিকীতে কোন লেখক,কোন উপন্যাস লেখেছেন এখনকার পাঠক তা বলে দেবে। পূজাবার্ষিকীগুলো বিক্রিই হয় উপন্যাসের জন্যে। কবিতা পড়তে কজন পাঠক পত্রিকা কেনে???? 
এক কাজ করুন স্পর্শবাবু। একটা উপন্যাস লিখে ফেলুন। ছাপাবার চেষ্টা করব। উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে আপনাকে অনেক মানুষ চিনবে। তারপর কবিতা-তবিটা যা লেখার লিখবেন।"
-"সামন্তবাবু,আমি একজন কবি। আমার সাহিত্যপ্রতিভার বিকাশ ঘটবে উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে? এটা ভাবতেও পারি না!! তার থেকে একটা কাজ করুন না। আপনাদের পত্রিকা তো পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে নামকরা পত্রিকা। ওখানে আমার কিছু কবিতা নিয়ে একটা ক্রোড়পত্র বার করুন না। সাধারন মানুষের (পাঠকের) আমাকে চেনার এর থেকে ভালো উপায় আর কি থাকতে পারে!"
ভদ্রলোক এবার উচ্চস্বরে হাসলেন।
সাধারণত এধরনের হাসি মধ্যেরাতে হায়েনা'দের গলা থেকে শুনতে পাওয়া যায়। কি আশ্চর্য! !! ভদ্রলোককে এখন দেখাচ্ছেও হায়েনার মত। কিচ্ছুক্ষণ আগে ছুঁচোর মত লাগছিল না!
-"স্পর্শবাবু,এর মানে আপনি বলতে চাইছেন আমি আমাদের বৃহত্তম পত্রিকায় দেড়-পেজ জুড়ে আপনার কবিতার ক্রোড়পত্র বের করব... তাই তো?"
-"হুম্"
-"দেড় পেজ এর দাম আপনি জানেন?? ওই জায়গায় দুটো বিজ্ঞাপন দিলেই ৮ লাখ উঠে আসবে। আপনি কখনও দেখেছেন আমাদের পত্রিকায় দির্ঘপেজ জুড়ে আমরা কোনো অনামি লেখকের ক্রোড়পত্র বার করেছি?? "
- "আপনি আমার ক্রোড়পত্র ছাপাবার পরেই আমার কবিতা নিয়ে একটা বই বার করে ফেলুন না। রয়ালিটি লাগবে না। তাতেই টাকা উঠে আসবে।"
ভদ্রলোক আবারও হাসতে শুরু করলেন।
এবার আমি বিরক্ত লুকানোর চেষ্টা করলাম। কি এমন কথা বললাম যাতে এত হাসি পায়! আচ্ছা আমার মুখ কি এখন ছুঁচোর মত দেখাচ্ছে?
-" স্পর্শবাবু,আপনার ধারনা নেই আপনি কি বলেছেন। শুনুন,আমরা একটা উপন্যাস পূজাবার্ষিকীতে বের করি। সেই উপন্যাসএর টানে পাঠকরা পত্রিকা কেনে। তারপর আবার সেই উপন্যাসটাই মলাটে বন্দি করে দু-তিনশ টাকায় বাজারে ছাড়ি। আবারও তা বিক্রি হয়ে যায়। কেউ পত্রিকায় না পড়ার কারনে কেনে,,কেউ সংগ্রহে রাখার জন্যে কেনে। কবিতায় লাভ নাই ভাই। পূজাবার্ষিকীগুলোতে একটা-দুটোর বেশি কবিতা দেওয়া যায় না। আর একটা-দুটো কবিতা দুশো টাকায় বিক্রি হয় না স্পর্শবাবু। তাও ধরুন আমি আপনার একটা বই বাজারে বের করলাম। আপনি খুব ভালো লেখেন আমি জানি। হয়ত কিছু পাঠক কিনলো। তাদের ভালো লাগল। দু-একজন পাঠক আপনার নাম জানলো। নাম জানার সাথে সাথেই দেখবেন দু-একদিনের মধ্যে আপনার বই এর একটা পিডিএফ(PDF) ভার্সন বেড়িয়ে গেছে। টাকা খরচ করে কে কবিতার বই কিনতে যাবে? একশোর মধ্যে কিনবে একজন। হাজারে দশজন। তাদের ওই বই কেনায় আমার তো পেট চলবে না। আপনি ফেমাস হলেও আমার পেট চলবে না। আপনার নাম ছড়াবে পিডিএফ (PDF) এর মাধ্যমে। আপনি ফেমাস হবেন। আমরা প্রকাশকরা ডুবব। একটা উপন্যাস লোকে ধৈর্য ধরে ইবুকে পড়বে না। সবাই তা পড়তেও পারে না। কিনে নেবে। কিন্তু একটা কবিতা পিডিএফ এ পড়তে কোনো বাঁধা নেই। বুঁঝছেন???"
-"এই ইবুক-পিডিএফ এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে আমরা কি এক আছাড় মেরে রাস্তায় এনে ফেলছি না সামন্তবাবু?"
-"সেটা আমাকে বলছেন কেন? পাঠকদের বলুন। এজন্যই প্রতিবছর ডজনে-ডজনে লেখক জন্মাচ্ছে। কবি কটা জন্মায়? এক কাজ করুর স্পর্শবাবু,,পিডিএফ নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলুন। সামনের সংখ্যায় ছাপার চেষ্টা করব। হা হা হা।
স্পর্শবাবু এখনতো উঠতে হয়..একটু কাজ আছে। আপনি চা খাবেন??"
-"না"
-"খান এক কাপ। দিতে বলি?"
-"না থাক।"
প্রকাশনা থেকে বাইরে বেড়িয়ে আসলাম।
আজ আকাশ মেঘলা,বৃষ্টি হব হব করেও হচ্ছে না। আমি এখন পার্কের একটা বেঞ্চিতে বসে আছি। প্রত্যেক রোববার এটাই আমার একমাত্র রুটিন। বিভিন্ন প্রকাশনায় হাঁটাহাঁটি করা। প্রায় পাচঁ বছর ধরে করে আসছি। আগে সপ্তাহে তিন-চারদিন এই রুটিন ছিল,একটা সরকারি চাকরি পাবার পর রোববার ছাড়া আর সময় হয় না।
রোববার দিনটায় সারাদিন আমি কিছু খাই না। খালি পেটে নাকি খুব ভালো কবিতা আসে। বহুবছর আগে 'একজন' একথা বলত। এখনো চোখের সামনে ভাসে সেই দিনগুলি। আমি পড়ার টেবিলে একমনে বসে কবিতা লিখতাম। 'ও' জানালা দিয়ে এসে বিরক্ত করত।
-"এই যে কবিসাব, কি করছেন?"
-"তিথি এখন লিখছি,বিরক্ত কর না।"
-"কি লিখছেন একটু বলুন তো। নতুন কি কবিতা,কবিতার নাম কি?"
- "নাম বললে তুমি বুঝবে?"
-"কবিতাই বুঝিনা,আর নাম! হা হা হা...."
বলেই 'ও' চুরি নাড়িয়ে হাসত। চুরির সেই রিনঝিন রিনঝিন শব্দে আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠত।
-"কবিতার নাম হল 'তিথি'। "
'ও' লজ্জা মাখা গলায় বলত..
"ইস! অন্য কোনো নাম পেলেন না? আপনি খুব অসভ্য"।
-"অসভ্যের কি দেখলে,আমার পরের কবিতার নামও ঠিক করা হয়ে গেছে। কি নাম জান?"
-"কি??"
-"আদর।"
-"ইসসস দুষ্টু... আপনার সাথে আর কথা নেই।"
-"আপনি আপনি করছো কেন??"
-" নয়ত আর কি বলব? ওত বড় দাড়ি রেখেছেন। আপনাকে দেখাচ্ছে সাধুপুরুষের মত।"
-"কবিরা এরকম দাড়িই রাখে। রবি ঠাকুরের দাড়ি দেখনি?"
-"উনি কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে দাড়ি রাখতেন। তরুন বয়সে ওনার খুব সুন্দর গোঁফ ছিল। তোমার তো মনে হয় গোঁফই ওঠে নি। হাহাহা...."
বলতে বলতেই ওর চুরি আবার বেজে উঠত। মন স্পর্শ করে যেত সে শব্দ।...
পার্কে বসে মেঘলাদিনে এসব ভাবছি। ঘোর কাঁটল এক বাদামওয়ালার ডাকে-
'বাবু,বাদাম লিবেন?'
-"টাকা নেই ভাই। আজকের দিনে আমি টাকা নিয়ে বেড়াই না। আমাকে বিভিন্ন প্রকাশনায় ভিক্ষা করে বেড়াতে হয়। তবে তুমি যদি একঠোঙা বাদাম দাও,মূল্যবান একটা জিনিস পাবে।"
-"কি?"
-"কবিতা। আমার লেখা নতুন একটা কবিতা"।
বাদামওয়ালা আমাকে অবাক করে একঠোঙা বাদাম দিয়ে বলল
-'কন। একখান কবিতা কন। শুনি।'
আমি বলতে শুরু করলাম....
"খুব সম্ভবতঃ একজন প্রেমিক ছিল সে, 
কাগজের ভাঁজে গোপনে জমাতো জোছনার জল, তারার সুর, ক্ষয়ে পড়া পালকের মত দীর্ঘশ্বাস কিছু।..
নৃশংস ছাই হয়ে ঝরে যেতে যেতে একদিন জেনে গেলো-
এই শহরে নির্ঘুম সোডিয়াম লাইটেরা নিশ্চুপ থেকে সারারাত শুধু প্রায়শ্চিত্তের কথা ভাবে।
মাছরাঙার নীল ডানায় প্রতীক্ষায় না থেকে একদিন-
বহুবার করে বাঁচার সাধ হল তাঁর-কবিতার।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে নতুন পৃষ্টা, ছাই ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ঝলমলে বাজ ফিনিক্স। 
মাছির চোখের দ্যুতি নিয়ে পৃথিবীকে দেখছিল, নতুনভাবে, হাজার রাত্রির রূপকথা- যেন গুঁড়িয়ে যাওয়া শত টুকরো আয়নার ভেতর শত শত কবিতা'কে।
যা কোনোদিন কোনো মলাটে ঠাই পাবে না।........."
হঠাৎ কবিতা থামিয়ে আমি বাদামওয়ালাকে ত্বারস্বরে জিজ্ঞেস করলাম
-"চুরির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন?? রিনঝিন রিনঝিন চুড়ির আওয়াজ??"
তিনি গভীর বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।।

Monday, 6 July 2015

ছোটগল্প ~ ঋজু পাল

শেষ থেকে শুরু 
ঋজু পাল :~

    সকালে বাড়ি ফিরলাম , শরীর টা বড্ড দুর্বল এখনো । তিন দিন হসপিটাল এর বিছানাতে কাটানোর পর আজ নিজের চেনা পরিবেশে ফিরতে খুব ভালো লাগছে । বাড়ির পরিবেশ এখনো থমথমে । বউদি পর্যন্ত কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে ফেলেছে । বাবা সেই যে ট্যাক্সি থেকে আমায় নামিয়ে ঘরে নিয়ে এল , তারপর থেকে আর দেখতে পাচ্ছি না । মা বোধহয় ঠাকুর ঘরে , যমের মুখ থেকে ছেলে ফিরে এসেছে ,ঠাকুরের প্রাপ্য ধন্যবাদ টুকু দিতে গেছে ! আর আমি? খোলা জানলা দিয়ে চারপাশের আলো ঝলমলে আকাশ তাকে দেখছি, সত্যি ই কি কোন দরকার ছিল ওরকম একটা পদক্ষেপ নেওয়ার ? জানি না। 
হটাত আমার সাত বছরের পুচকু ভাইপো এসে বলে ফেলল ; কাকু তুমি আর যাবে না তো আমায় ছেড়ে ? তাহলে আমায় ঘুরতে কে নিয়ে যাবে ? বাবা র মত তুমিও স্টার হয়ে.........।
ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম , না সোনা ,কোথাও যাবো না আমি । প্রমিস করলাম।
নাহ , এত ভালবাসা কে অগ্রাহ্য করার মত দুঃসাহস আমার নেই । নতুন জীবন শুরু করতে আমায় হবেই , পুরনো ডায়েরি গুলো কি করবো , ফেলে দেব ? স্মৃতি আঁকড়ে বসে থেকে কোন লাভ নেই ।
এই তো সেদিনের কথা , TCS এর ক্যাম্পাস প্লেসমেন্ট চলছে । দুটো ধাপ টপকে দুরু দুরু বক্ষে অপেক্ষা করছি শেষ ধাপের জন্য। মনে হচ্ছে পারবো না ,হবে না। মোবাইল টা বন্ধ করতে গিয়ে একটা মেসেজ চোখে পড়ল , All the best dear ! u have 2 do it smile emoticon 
মুহূর্তেই হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম । তারপর ? ...............
----হ্যালো , রাহুল দা , selected !!!!!!!!!! 
---জানতাম এটাই হবে । Heartiest congratulations !!!! যা বাড়ি যা , রাতে ফোন করছি ।
এই হল রাহুল দা , আনন্দে টগবগ করলেও বাইরে থেকে বোঝা যায় না । দেখতে দেখতে দুবছর হয়ে গেল ,we r in a relationship ! আমাদের আলাপ Rainbow Pride Fest walk এ ।নিছক বন্ধুত্ব , তারপর একটু একটু ভাল লাগা , অতঃপর ভালবাসা । আজ চেন্নাই তে থাকলেও প্রতিদিন যোগাযোগ রাখা , কথা বলা কোনটাতেই খামতি নেই ।
মা খুব রাগারাগি করেছিল, বউদি ও , কলকাতা ছেড়ে চেন্নাই কেন যাচ্ছি । মা কে কোনমতে বুঝিয়েছিলাম , চাপ এর কি আছে , রাহুল দা আছে তো , এক অফিস , এক এপার্টমেন্ট , কোন অসুবিধা হবে না।
বাড়িতে সবাই জানে ,রাহুল দা আমার খুব প্রিয় বন্ধু , কিন্তু ওই টুকুই । তার বেশি কিছু বলার মত সৎসাহস আমার ছিল না ।
তারপর আর কি , চেন্নাই তে পা দেওয়া , একে নতুন জীবন , তারপর নিজের ভালবাসার মানুষের সঙ্গে একসাথে থাকতে পারার আনন্দ যে কতটা হতে পারে , সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এক সাথে অফিস যাওয়া, ফেরার সময় ঘুরে ফিরে ফ্ল্যাটে আসা , রান্না নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা , আর অনেক টা ভালবাসা !
সব তো ঠিকই চলছিলো , তবু কেন এমন হল ... রাহুল দা র বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য জোর করা , অপ্রত্যাশিত ভাবে ওর রাজি হওয়া, নিজের একটা আলাদা এপার্টমেন্ট খুঁজে নিতে অনুরোধ করা , আমার কান্নায় ভেঙে পরা ..................সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছিল !
কটা ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম ঠিক মনে নেই , তবে এটুকু খেয়াল আছে বাড়ির আর অফিস এর অনেককেই হসপিটাল এ দেখতে পেলেও , একজন কে পাই নি । আমার অভস্ত্য চোখ শুধু খুঁজে বেরিয়েছে তাকে , একসময় ক্লান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ।
বাবু , তোর একটা চিঠি এসেছে , এদিকে আসতে পারবি ? বউদি র গলা শুনে চমকে উঠলাম । নিজের অজান্তেই কখন অতীতে ফিরে গেছিলাম।
সই করে চিঠি টা নিয়ে দেখি , Tech Mahindra র অফার লেটার ! কবে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম আর আজ এল ,পোস্টিং কোলকাতা তেই ।
কার চিঠি রে ? মা এগিয়ে এল ।
মা , আমি TCS ছেড়ে ভুল করি নি , আমি রাস্তা খুঁজে পেয়েছি । এবার নতুন করে সব শুরু করব ,শুধু তোমাদের জন্য !
হার সৌরভ কোনদিন মানে নি , মানবেও না।

Sunday, 21 June 2015

ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না ~ অভীক মুখার্জী

ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না ~ অভীক মুখার্জী 
-----------------------------------
ফেব্রুয়ারির হাওয়া জানান দিচ্ছে গরম আসতে খুব দেরি আর নেই; নরেশের দোকানের শিঙাড়ায় ফুলকপি কমে যাবে, কাঁচের শিশিতে জমে যাওয়া নারকোল তেল আর গলিয়ে মাখতে হবে না, ছোট জলাগুলো শুকোতে থাকবে; ঐ যে বললাম, গরম আসতে খুব দেরি আর নেই।
আমার আকাশ – বাতাস চমকানো ঈশ্বর – পৃথিবী – ভালবাসা মাথায় নিয়ে কৃষ্ণরামপুর বাজার থেকে হেঁটে যাচ্ছি বদরতলার দিকে, চোখে পড়ল একটা চেনা চেনা মানুষ। মানুষটা চেনা নাকি বলা মুশকিল হলফ করে, চেনা হলে তো একবারেই চিনে ফেলতাম; অচেনাও নয় তাহলে চিনতে চেষ্টাই করত না আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্ক।
উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা একটা অবয়বকে খুব দ্রুত মাথার ভিতরে সার্চ করে বেরাচ্ছি, যাতে চিনে নিয়ে কিছু একটা বলতে পারি, কারণ চোখের সামনে দেখছি যিনি আসছেন আমার উলটো দিক থেকে তিনি আমার দিকে স্মিত হাস্য পাত করেই আছেন।
এই আমার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, এতেই আমি আস্থা রাখি, ঐ বয়সের কেউ আমার স্যার না হলেও স্যার বলে ডাকতে কাউকেই দোষ হয় না, স্যার মানে মহাশয়, মানে স্যার ডাকে সবাইকেই সইয়ে দেওয়া যায়।
-স্যার ভাল আছেন?
-চিনতে পারলে তবে?
-হ্যাঁ স্যার, আপনাকে চিনব না! সেকি কথা!
-না, এখন আমি অনেককে চিনতে পারি না তো, বয়স হয়ে গিয়ে নার্ভগুলো আর কাজ করে না। ঐ যে অলফ্যাকটরি নার্ভের কি একটা প্রবলেম বলেছিল সচিন ডাক্তার... মমমমম... মনে পড়ছে না।
মনে পড়ে গেছে ততক্ষণে আমার, রবিন বাবু, রবিন হালদার, আমাদের, মানে আমার মাধ্যমিকের টিউশনের বিজ্ঞান টিচার, রবিন বাবু। সামান্য একটা অলফ্যাকটরি নার্ভের উল্লেখ আমাকে মনে করিয়ে দিল বিজ্ঞান স্যারের কথা, নাহলে মনেই করতে পারছিলাম না। যেন এক দশকে পেরিয়ে গেছেন অর্ধ শতক। সেই চোখের দীপ্তি, মুখের লালিমা, প্রশস্ত বপু সব কালের কপোলে নোনা জলের ধারার মত হারিয়ে গেছে; ঘোলাটে চোখ, তামাটে মুখ, কোলকুঁজো দেহ নিয়ে রবিন স্যারের সেই পুরানো ছবি ইতিহাসের মত লাগল আমার মনের কোনও এক কোঠায়। যেমন কুষাণ সম্রাট কনিস্কের স্কন্ধ কাটা মূর্তির ছবি দেখেছি জীবন মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস বইতে, ঠিক তেমনি আমার বিজ্ঞান স্যার দাঁড়িয়ে আমার সামনে।
- এইরে একটা ভুল করে ফেলেছি মনে হচ্ছে, অলফ্যাকটরি নার্ভের কথা বললাম কিনা! ওটা বোধ হয় ঘ্রাণের কাজে লাগে, মনে নেই কিসে মনে থাকার কাজ হয়। মনে পড়ছে না। তোমার নামটাও মনে পড়ছে না, কিছু মনে কর না, খুব চেনা লাগল তোমাকে তাই দাঁড় করিয়ে দিলাম আর কি। নামটা যেন কী.... মমমম....অরিন্দম?
- না স্যার আমি মৃদুল; ২০০৫ সালের মাধ্যমিক ব্যাচ। মনে পড়ছে?
- না এখন তেমন মনে পড়ে না। অনেককেই চিনতে পারি না বললাম যে, অনেকে আমাকেও চিনতে পারে না।
দেখছ তো কি হাল আমার। আমি তো স্কুলের মাস্টার নই যে পেনসন মিলবে! টিউশন করতে পারি না এখন, ঐ যে কিচ্ছু মনে থাকে না, পড়াব কি! ভুল হয়ে যাচ্ছিল, ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলতে হলে নেতা হতে হত, কোনও স্যার কি তার ছাত্র – ছাত্রীর নেতা হতে পারে নাকি?
এখন সবাই আমাকে দেখলে ভয় পায়, সরে যায়, কথা বলে না, যদি আমি ধার চাই।
বুঝলাম রবিন স্যার এখন সমাজে ব্রাত্য।
- তা তোমাকে তো অনেকদিন দেখিনি, থাকো কোথায়?
- চাকরি করি স্যার। মুর্শিদাবাদে থাকি। ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট।
- তাই নাকি! এটা জানতাম না তো!
বলতে গেলাম, ‘সেকি স্যার সবাই তো জানে’। পারলাম না, থামতে বাধ্য হলাম, টের পেলাম আমি এমন কিছু হাতি ঘোড়া বশ মানাইনি যে তার জন্য আমাকে এক ডাকে চিনতে হবে।
- তা ভালো। মুর্শিদাবাদ ভালো জায়গা। ঐতিহাসিক স্থান। আমি বিজ্ঞান পড়াতাম বটে, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে প্রচুর পড়তাম। এখন আর পড়ি না, মনে রাখতে পারি না। তা ঘুরে দেখলে বাচ্ছাওয়ালি কামান, সিরাজের খাবার প্লেট, আজিমুন্নেসার কবর? দেখলে... দেখলে....মমমম....?
ইতিহাস নিয়ে ব্যস্ত আমার বিজ্ঞান স্যারকে ফিরতি উত্তরে বলব কেমন করে যে আমার ঐসবে উত্সাহ নেই। ভাবছি যে কেনই দেখা হল, একটা খ্যাপাটে লোক রাস্তায় বেশ উত্তেজিত ভাবে আমাকে প্রশ্ন করছে দেখে অনেক চেনা অচেনা মানুষ দেখছে।
- না স্যার দেখা হয়নি, দেখে নেব, সময় হলেই দেখে নেব।আসলে কাজের খুব চাপ জানেন তো। ছুটির দিনে গিয়ে দেখে নেব।
বিশ্বাস করুন আমি অমন জ্বলন্ত অথচ করুণ দৃষ্টি কোনও দিন দেখিনি। এক পাত্রে আগুন আর জল দুটো সহাবস্থান করানো সম্ভব হলে যেমন দেখাত ঠিক তেমনি লাগল স্যারের চোখ।
- তুমি জানো কি, History has no holiday? তেমনি জেনে রাখো, ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না।
রবিন স্যার আর দাঁড়ালেন না, অসীম বিরক্তি, অদ্ভুত রাগ নিয়ে জায়গা ছেড়ে হাঁটা দিলেন।
আমি কিঞ্চিত স্তম্ভিত, হতভম্ব।
স্থাণুবৎ দণ্ডায়মান আমি। পাশের ওল্ড বেনারস রোড ধরে ছুটে যাচ্ছে ধর্মতলা – গড়েরঘাট রুটের বাস, মহীনের চায়ের দোকানে টুংটাং শব্দের জিগির তুলে কাঁচের গেলাসে চিনির বিয়ে গরম জলের সাথে, অনুপম রায় গাইছে 98.3 FM Radio তে, ‘বসন্ত এসে গেছে...’।
মাথায় একটা কথাই ভাসছে, ‘ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না’।

Saturday, 20 June 2015

|| অপরাহ্ন || ~ স্পর্শের বাইরে

                      



আমি সাধারণত সামাজিক,অভিজ্ঞতালব্ধ গল্প লেখার চেষ্টা করি। কাল রাতে অলৌকিক গল্প লিখতে গিয়ে দেখলাম,, ব্যাপারটা বেশ কঠিন !
|| অপরাহ্ন ||
_______________

আমার ডাক নাম শর্মি। তবে ও আমাকে 'সু' বলে ডাকতো।
কি সুন্দর এক অক্ষরের মিষ্টি নাম না ! মাঝে মাঝে ও যখন আমাকে সু বলে ডাকতো,তখন মনে হত এর থেকে ভাল এক অক্ষরের নাম হয়ত পৃথিবীতে আর একটাও নেই।
আমি যখন পার্কে বা রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতাম,তখন ও পেছন থেকে এসে হঠাত করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরতো। কোন তরুনীকে যদি হঠাত তার প্রেমিক ভালোবেসে চুপিচুপি পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে,,তখন সে খুব তৃপ্তি পায়। ওর এই পাগলামিতে আমিও ভিষন খুশি হতাম। মনে মনে খিলখিল করে হেসে উঠতাম। কিন্তু ওকে বুঝতে দিতাম না। গম্ভীর গলায় বলতাম - "রাস্তাঘাটে এসব অসভ্যতা আমি পছন্দ করি না"।
ওর মুখটা যখন করুন হয়ে যেত,,আমি তখন হেসে হেসে ওর মাথার একঝাক চুল এলোমেলো করে দেবার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সবসময় পারতাম না। ও খুব লম্বা ছিল।
বিকেলের এই সময়টা আমার খুব ভাল লাগে। সূর্য মাথা নুইয়ে নেয়,এদিকে অন্ধকারের ছিটেফোঁটাও থাকে না। এই সময়টাকে খুব সুন্দর ভাষায় কি যেন বলে?? অপরাহ্ন।
আচ্ছা আপনি কখনো ঠকেছেন?? ভালোবাসায় ঠকেছেন?? আপনার কাছের মানুষ'টা যার সাথে সারাটা জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন,,সে হঠাত করে আপনাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দূরে সরিয়ে দিয়েছে??? তখন ঠিক কিরকম অনুভব করেন???
ভিষন রেগে যান?
কান্নাকাটি করে সারাক্ষন নিরবে গাল ভিজিয়ে রাখেন?
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তার কথাগুলো মনে পড়ে আর ঘুম আসতে চায় না?
তার পুরোনো ছবি'গুলি নষ্ট করেও স্মৃতির আয়নায় বারবার সাজিয়ে রাখেন?
তাকে অন্য কারও জীবনে জড়িয়ে পড়তে দেখে মনে মনে দির্ঘনিশ্বাস ফেলেন বলেন,,'আমি আজও তোমায় ভালোবাসি'?
আর তারপর বুক দাপড়িয়ে নিজেকে সান্তনা দিয়ে বলেন,,'এখনও অনেকদিন পড়ে আছে'?
তারপর একসময় স্মৃতিপট গুলো মনের খুব গভিরে ধামাচাপা দিয়ে ভব্যিষতের জন্য প্রস্তুতি নেন?
এর মধ্যে কোনটা? যেটাই হোক,আপনি নিজেও জানেন না এই পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের থেকে আপনি অনেক ভালো আছেন। অনেক সুখে আছেন।
আজ বিকেলে আমার এই ছোট্ট এককামড়ার ঘর'টায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাত করে খাটের কোনায় এই ডায়েরি'টা চোখে পড়লো। আমি ক্লাস ১২ অবধি পড়েছি। লেখাপড়া জানি। তাই ডায়েরি পৃষ্টা উল্টিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করলো। আমি কোনোদিনও সেভাবে কিছু লিখিনি,তাই আমার কাছে ইচ্ছাটা খুব লজ্জার। ঠিক যেমন ১৪ বছরের কিশোর ঠোটের উপর কালো রেখার অস্তিত্ব দেখে লজ্জা অনুভব করে।
আমি খুব দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। আমরা ৫ বোন। কোন ভাই নেই যে ভবিষ্যতে বাবার শিরদাঁড়া'র অবলম্বন হয়ে উঠবে। বাবা হাড়-ভাঙা খাটুনি খেটে আমাদের মানুষ করেছে।
আমি তখন আমার জীবনের প্রথম প্রেমে পড়ার আনন্দে মশগুল। ছেলেটাকে প্রথম দেখায় কিভাবে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম জানিনা।
একদিন হঠাত বাড়ি থেকে পালাম। যদিও পালানোর কোন প্রয়োজন ছিল না। বাবা-মা'র ঘাড় থেকে একটা মেয়ে নেমে গেল ভেবে হয়ত এমনিই ছেড়ে দিত। তবুও 'ও' বললো হঠাত করে বিয়ে সেরে ফেলতে।
যাকে মন থেকে বিশ্বাস করে ভালোবাসা যায়,তার হাতে হাত রেখে মৃত্যুকে পর্যন্ত আপন করে নেওয়া যায়। সেই জায়গা থেকে পালানো'টা তো সামান্য কিছু।
আমার ভেজা ঠোটের দিকে তাকিয়ে 'ও'র চোখ দুটো যখন ঝিকমিক করে উঠতো,তখন নিজেকে এই পৃথিবীর সবথেকে সুখি নারী বলে মনে হত।
জীবনের প্রথম চুম্বন কেউ ভোলেনা।
আমার আজও একটু একটু মনে পড়ে। ও'র সেই শরীরের ঘ্রান,উদ্দিপনা,ঘামে ভেজা চকচকে সুঠাম দেহ আমাকে মাতাল করে তুলতো। মাঝেমাঝে এই পুরুষ'টা একমাত্র আমার ভেবে নিজেকে কি ভিষন সৌভাগ্যবতী মনে হত!
দুজনে মিলে একদিন ঠিক করলাম,,একদিন স্বামী স্ত্রী হয়ে বাড়িতে গিয়ে বাবা-মা'র কাছে ক্ষমা চাইবো। তিন বোনের জন্য চুড়িদার,বড়'দি আর মায়ের জন্য দুটো ভাল তাঁতের শাড়ি,,,আর বাবার জন্য একটা নতুন দামী টেপরেকর্ডার কিনে নিয়ে যাব।
আমার বাবা খুব ভালো গান গাইতে পারে। সব তার নিজস্ব গান।
ছোটবেলায় আমরা ৫ বোন জেগে থাকতাম। রাতে খাওয়ার পর কখন বাবা কাঁঠাল গাছের তলায় শোয়ানো ভাঙা চৌকিটায় বসে গান ধরবে।
বাবা'র কোন গানের কথা মনে না থাকলেও সুর'গুলি আজও আমার মনে আছে। সুর লেখার উপায় জানা থাকলে আপনাদের লিখে শোনাতাম।
নতুন টেপরেকর্ডারের একটা সখ বাবা'র অনেকদিনের। যেটায় বাবা নিজের গান'গুলি ধরে রাখতে পারবে। আমাদের প্রত্যেকদিনের খাবারের চাহিদা'র কাছে সেই সখ কোনদিনও অম্লান হতে পারেনি।
ও যখন দীঘা'য় হানিমুনের কথা বললো তখন মন'টা আনন্দে মেতে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল,আমি এত সুখি কেন? দীঘা'য় আসার আগে দুজনে মিলে কেনাকেটা করতে বেড়িয়েছিলাম। মনে আছে সেদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। ও ভালোবেসে আমাকে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি কিনে দিয়েছিল। জিনিস'টার দাম সামান্য হলেও মনে হয়েছিল,এর থেলে মূল্যবান কোন উপহার কি এই পৃথিবী'তে আর একটাও হতে পারে!! বাদবাকি কেনাকাটা দীঘা'র জন্য রেখে দিয়েছিলাম,ঠিক যেমন ভালোবাসা'টুকু তুলে রেখেছিলাম সমুদ্রের ঢেউ এর জন্য।
ওর দেওয়া সেই লাল শাড়ি পরেই আমি জীবনে প্রথম ধর্ষিত হই।
হঠাত একদিন নিজেকে আবিষ্কার করি এই এককামড়ার ঘরে। ভালোবাসার আনন্দ প্রথম নথ ভাঙার প্রচন্ড কষ্টের কাছে হার মেনেছিল। দু'পা ভেষে গিয়েছিল রক্তে।
প্রথমে অনেক চিতকার করে বাইরের জগতের কাছে নিজের অস্তিত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। দু'দিন পরে বুঝলাম আমি নরকে এসে পড়েছি। এখানকার জগত বিষাক্ত ভালোবাসায় ভর্তি।
আমাকে সবসময় দরজা বন্ধ করে রাখা হত। এখনও হয়। আমি প্রচন্ড ভয়ে গুমরে থাকতাম। প্রথম প্রথম দরজা খোলার চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। পরে নিজেই ভয়ে থাকতাম যেন এই ঘরের দরজা কখনো না খোলে,,কারন দরজা খোলার সাথে সাথেই এক একজন করে উন্মত্ত,হিংশ্র পশু এই ঘরে ঢুকতো। ওরাও 'পুরুষ' এবং 'মানুষ' শ্রেনীর মধ্যে পড়ে। আমি অনেক ক্ষুদার্ত হায়েনা'র সামনে একদলা মাংশপিন্ড হয়ে উঠলাম।
যে ভালোবাসার জন্য একসময় ঘর ছেড়েছিলাম,,তারপর থেকে সেই ভালোবাসার ভয়েই এ ঘরে আটকা পড়ে রইলাম।
প্রথম দু'মাস দুরন্ত কষ্টের পরে একসময় যেন নিজের থেকেই মানিয়ে নিলাম। গলার থেকে নিচের অংশের কোন গুরুত্ব আমার কাছে রইল না। আমি তখনও বুঝিনি আমি এ ঘরে কিভাবে এলাম।
আমার এ ঘরে একটা জানালা ছিল। জং ধরা লোহা'র শক্ত জানালা। নাজানি কতদিন খোলা হয়নি। বহুদিনের প্রচন্ড চেষ্টার পর একদিন সেই জানালা খুললাম। আমার ঘরে প্রায় তিন'মাস পরে সূর্যের আলো এসে পড়লো। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম আমার ঘর'টা দোতলায়। নিচে কতো কতো মেয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায়েনা'দের সাথে দর কষাকষি করছে। আমি বুঝতে পারলাম,আমি কোথায় এসে পড়েছি। আরও দু'দিন পর বুঝতে পারলাম,আমাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই পৃথিবীতে সবজায়গায় একটা নির্দিষ্ট বাজার থাকে,,যেখানে নারী'রা বিক্রি হয়,, পুরুষ'রা কিছু সময়ের জন্য কেনে,সভ্যতা...সভ্যতার মত এগিয়ে যায় আমাদের মত কিছু কিছু মানুষ'কে অসভ্য তকমা'য় ভূষিত করে।
জানালা থেকে সেদিন ওকে দেখেছিলাম। আমার সেই প্রানের পুরুষ। সেই একমাথা ঝাঁকানো চুল নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে বয়স্ক একজন মহিলা'র সাথে কথা বলছে।
হঠাতই আমার সাথে ওর চোখাচোখি হল। ও কিছুটা ঘাবরে গেল। মুখটা থতমত হয়ে গেল। আমার দিকে আর না তাঁকিয়ে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে চলে গেল। ঠিক যেন পালিয়ে গেল।
কিজানি কেন ও'র ওপর আমার বিন্দুমাত্র রাগ হলো না। অথচ সেটাই হবার কথা ছিল। ইচ্ছা করছিল ওর থতমত করুন মুখের উপরের সেই একঝাক চুল ঘেঁটে এলোমেলো করে দি। কিন্তু পারতাম কি? ও যে ভিষন লম্বা!
কিন্তু রাগ আমার হলো। হলো কিছুদিন পর। ও'কে আমি ভিষন ভালোবেসে ছিলাম। ও আমাকে প্রত্যাক্ষান করতে পারতো। নাজানিয়ে অজ্ঞানবস্থায় এই বেশ্যালয়ে বিক্রি কেন করে দিল?? কত টাকা পেয়েছিল তাতে 'ও'? আমার ভালোবাসাস মূল্য দিয়ে সেই দাম মাপা গেলে,,,একবার মেপে দেখতাম।
আমি সারাদিন এই ঘরে খাটের উপর শুয়ে থাকতাম। এখনও থাকি। পশুগুলো যখন আমার দেহের উপর উন্মত্ত হয়ে উঠত,আমি উপরে ঘুরন্ত ফ্যান'টার দিকে একদৃষ্টে তাঁকিয়ে থাকতাম। ফ্যান'টা ঘুরতে ঘুরতে একসময় যেন হলুদ হয়ে যেত। কাঁদতে কাঁদতে একসময় যেমন মানুষের চোখের জল অজান্তে হলুদ হয়ে ওঠে। ফ্যান'টা সারাদিন ঘুরতো। যেন হাওয়া দিয়ে আমার সব বেদনা,কষ্ট উড়িয়ে নিতে চাইছে। ফ্যান'টাকে আমি ভালোবেসে ফেললাম।
একদিন জানালা'র শিঁক ভেঙে একটা চাকু'র মত বানালাম। তারপর জিনিস'টাকে খাটের পায়া'র একটা গর্তে লুকিয়ে রাখলাম।
যদি কখনো আমার সেই প্রানের পুরুষ আমার এই ঘরে আসে,ওর একঝাক চুলের মধ্যে ওটা পুঁতে দিয়ে বোঝাবো,,ওর মতো আমিও ভালোবাসতে পারি।
হ্যাঁ একদিন 'ও' আসলো। একদিন বিকেল। বহুদিন পর। জানিনা হয়ত ভুল করেই আমার ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। ওকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম,,,,ও অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে ইতস্তত করছিল।
আমি ওকে সে সুযোগ না দিয়ে আপন করে নিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম কেমন আছো?? বেঁচারা উত্তর দিতে পারেনি। হয়ত অবরাধ বোধে ভুগছিল।
ওকে কাছে টেনে নিয়ে আমরা আবার মিলিত হলাম।
একসময় ও যখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন,আমি ধীরে ধীরে খাঁট থেকে নামলাম। খাঁটের পায়ায় লুকিয়ে রাখা চাকু'টা বার করলাম। তারপর উঠে আসলাম উপরে। ওর একঝাক চুলের মধ্যে ওটা সজোরে আঘাত করতে প্রস্তুত হলাম।।
নাহ!! পারলাম না। আমি হেরে গেলাম। ভালোবাসার মানুষ যতই দুরে ঠেলে দিক না কেন! হয়ত তার উপর রাগ হয়,,,কিন্তু চেষ্টা করলেও তাঁকে কষ্ট দেওয়া যায় না। শুধু নিরব কিছু অভিমান বুঁকের ভিতরে আটকে থাকে,,যা সে কখনো ভাঙাতে আসে না।
লোহা'র চাকু'টা আবার আগের জায়গায় রেখে দিলাম।।
এখন আমি মাঝে মাঝে বাইরে বের হতে পারি। দিনের বেলা এরা বেড়াতে দেয় না। বিকেলের পর থেকে নিয়ম কিছুটা শিথিল হতে থাকে। বিকেলে যখন লাইন দিয়ে আমার বয়সী মেয়েগুলিকে রোজগারের আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি,তখন খুব মায়া হয়। আর রাতে যখন দেখি সারাদিনের রোজগারের টাকা দিয়ে বেশ আরাম করে, হাঁটু মুড়ে আসন করে বসে গ্রাস পাকিয়ে ধবধবে সাদা ভাত খাচ্ছে,তখন সেই দৃশ্যটাকে কোন অচেনা শিল্পির জল রঙে অাঁকা পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরতম চিত্র বলে মনে হয়।
এক মিনিটটট!!
কে যেন আসছে। হ্যাঁ মনে হয় এই ঘরের দিকেই। হয়ত আবার এক উন্মত্ত পুরুষ আসছে মাংসের লোভে। প্রায়ই মনে হয় এদের বাড়িতেও আমার মতো দিদি,বোন বা মেয়ে আছে,,ওই দু'টি কালো চোখে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য এরা খুঁজে পায়না কেন??? এখন নিজেকে সত্যিকারের মানুষের থেকে ভূত বলে বেশি ভ্রম হয়।
আওয়াজ'টা প্রায় ঘরের সামনে এসে পড়েছে। আমাকে থামতে হবে..............
অনেকদিনের বন্ধ দরজা'টা হঠাত বিকট শব্দ করে খুলে গেল। তার ভিতরে ছুড়ে ফেলা হল এক উনিশ-কুড়ি বছরের মেয়েকে।
প্রচন্ড ঝড়ের পর গাছপালা'গুলোর যে অবস্থা হয়,তার সাথে এই মুহূর্তে মেয়েটার মুখের বেশ মিল পাওয়া যাচ্ছে। সাথে বেশ সুপুরুষ প্রায় ২৬-২৭ বছরের একটি যুবকও ঘরের ভিতরে ঢুকলো।
মেয়েটা কাকুতিমিনতি করছে.......
- প্লিজ আমাকে যেতে দাও। আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম,ভালোবেসেছিলাম। আমার সাথে এরকম কেন করছ?
- ভালো তো আমি এখনও তোমাকে বাসি সোনা। শুধু তোমার ওই ভালোবাসা'টুকু আরওও অনেকের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে।
- ছি:! লজ্জা করে না তোমার?
- লজ্জা আবার কি?? খায় না মাথায় দেয়। বেশি চাপ নিও না ডার্লিং। তোমার লজ্জা কমানোর দায়িত্ব আজ থেকে আমি নিলাম। আজ থেকে তোমার নাম রুমি নয়,,রঙ্গিলা। হে হে হে..........
- প্লিজ আমাকে যেতে দাও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আমি ছাড়া আমার মা বাবা'র আর কেউ নেই।
- অবশ্যই যেতে দেব সোনা। এই মুহূর্তে তুমি ছাড়াও আমার আর কেউ নেই। দুবছর ওয়েট করো। টাকা'টুকু ভালোভাবে উসুল হোক। তোমার শরীরের দাম কত জান! অনেকেকেকক! তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমার তো ডার্লিং গর্ব হওয়া উচিত।
- শয়তান,,জানোয়ার,,ইতর! তুই কতদিন আটকে রাখবি? একদিন ঠিক বেড়াবো! তখন তোকে খুন করে নিজে মড়বো দেখে নিস!
- তাই নাকিইইইইই?? খুব সখ? বেড়ানোর কথা কল্পনাতেও এনো না। হাজার চিতকার করলেও এই ঘর থেকে কেউ বেড়াতে পারে না। এর আগে একজন ছিল। অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারেনি। শেষে উপরে ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। তবে ততদিনে মার্কেট ভ্যালু উসুল হয়ে গিয়েছিল। তারপর উপরের ওই ফ্যান'টাও খুলে নেওয়া হয়।
যা হোক,শেষবারের মত তোমাকে একটু ভোগ করে নি। কাছে এস রঙ্গিলা.......
মেয়েটা ছিটকে এসে যুবক'টার গালে একটা চড় মারল।
- তবে রে! এত বড় সাহস!.........
মেয়েটার পেটে এক লাথি মেরে খাঁটের পাশে মেঝের উপর শুইয়ে দেয় যুবক'টি। তারপর চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে মেয়েটার প্রতি ক্রমশ হিংশ্র হয়ে উঠতে থাকে।
মেয়ে'টা নিজেকে বাঁচানোর প্রানপন চেষ্টা করে,কিন্তু বারবার বার্থ হয়। ততক্ষণে যুবক'টি মেয়েটির শরীরের উপর চড়ে বসেছে।
মেয়েটি ঠিক যে মুহূর্তে আস্তে আস্তে শিথিল হতে থাকে,,,তখনই তার কানে কে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে 'পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'। প্রথমে মেয়েটি কিছু বুঝতে না পারলেও পরে আবার একই শব্দ ফিসফিস করে করে উচ্চারিত হতে থাকে... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'.... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও' ... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'..
মেয়েটা পায়া'র ধারে হাত দিতেই হাতে শক্ত মতো কিছু বাঁধল। সেটা দিয়ে সজোরে যুবক'টির গলার ধারে আঘাত করলো।
জানালা'র শিঁক দিয়ে বানানো পুরোনো কিন্তু ধাঁরালো চাকু'টা যুবক'টিকে মুহূর্তের মধ্যে প্রানহীন করে দিল। তার গলা রক্তে লাল হয়ে উঠতেই মেয়েটা উপরের দেহ'টাকে ঠেলে সরিয়ে ঘরের চারিদিকে তাঁকাল। কোথাও কেউ নেই। একপাশে শূন্য খাঁট,,মরচে ধরা জানালা,দূরে কোথাও একটা খাতার মতো পড়ে আছে।
এই সময় কন্ঠ'টা আবার প্রতিধ্বনিত হল.....'পালাও'.............'পালাও'........'পালাও'..
মেয়েটা ভয়ে কুকরে আছে। দু'টো চোখে জোর করে পড়ানো কাজল উপচে জল নেমে সারা মুখ কালো কালো হয়ে উঠেছে। সে জানেনা এটাই তার শেষ সুযোগ। সে জানেনা তার পালানোর মধ্যে দিয়েই এই অপরাহ্ন'এ আরও একজনের মুক্তি ঘটতে চলেছে।
(শেষ)