Wednesday, 24 June 2015

পুস্তক পর্যালোচনা- প্রসেনজিৎ বন্দোপাধ্যায়



নাম : বিষকন্যা
ধরন : কাল্পনিক উপন্যাস
রচনা : দেবতোষ দাশ
প্রকাশনা : পত্র ভারতী
দাম : ১৫০ টাকা

আনন্দময় জীবন
~~~~~~~~~~~~~
জলের প্রতিভা।
.
প্রথমে উপন্যাসটির এই নামই রেখেছিলেন লেখক দেবতোষ দাশ। নামটি চয়ন করেছিলেন জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতা (‘তোমাকে’) থেকে। পরে ‘বাণিজ্যিক স্বার্থে’ নামটির পরিবর্তন ঘটান প্রকাশনার কর্ণধার ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। ফেসবুকের একটি গ্রুপকে দেওয়া ছোট সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছেন লেখক স্বয়ং।
.
নামের স্বার্থকতার চেয়েও বড় প্রশ্ন লেখকের এই প্রথম উপন্যাস কতটা স্বার্থক। পাঠের পরেই উপলব্ধি হবে যে পরম নিশ্চিন্তে নতুন উপন্যাসে হাত দিতে পারেন তিনি।
.
কবিতাময় এ উপন্যাস। বেশিরভাগটাই জীবনানন্দ। পাঠের সম্পূর্ণ আনন্দ তাই জীবনানন্দ অনুরাগীদেরই প্রাপ্য। তবে লেখকের প্রতিভায় বাকিরাও কিছুমাত্র বঞ্চিত হবেন না।
.
প্রথম পরিচ্ছেদে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ অরিন্দম কর্মসূত্রে দীঘা বেড়াতে এসে বাসেই আলাপ সেরে ফেলেছে শ্রুতকীর্তির সঙ্গে। দ্বিতীয়তে পরের দিন খেলাচ্ছলে সমুদ্রে নেমে ঘটল অরিন্দমের মৃত্যু। এ কি দুর্ঘটনা, না কি হত্যা, না দুইই? যদি হত্যা হয়, তবে কে করল?
.
উত্তরের জন্য অবশ্যই অপেক্ষা করার দরকার নেই শেষ পৃষ্ঠা অবধি। সঙ্গে-সঙ্গেই জবাব মিলেছে।
.
তবে বাকি আটত্রিশটি পরিচ্ছেদে কী রয়েছে? রয়েছে থামতে না চাওয়া পাতা ওলটানো আঙুল, রয়েছেন পরতে পরতে জীবনানন্দ আর কিছুটা শেকসপিয়ার, রয়েছে পাগল করা মধুজা সেন, রয়েছে রহস্যসন্ধানী ডিকে, হিংসা, প্রেম, কামনা, যৌনতা, আরও মৃত্যু, আরও কবিতাসহ জমাটি এক থ্রিলার।
.
হয়তো একটু বাড়িয়েই বলা হয়ে গেল। তাহলে কমগুলো এবার বলা যাক। কাহিনি অনেকটা চেনা পথে এগিয়ে জানা গন্তব্যেই শেষ হয়েছে। দুরন্ত কোনও চমক দিতে ব্যর্থই হয়েছেন লেখক। অপরাধীকে সামনে পেয়েও ঠকে যাবার, শিকার ফসকে যাবার যন্ত্রণা ও ধরা পড়ে যাবার উৎকণ্ঠা পাঠককে দিতে কোনোই চেষ্টা নেই। পৃষ্ঠাগুলো চোখ বড় বড় করে গোগ্রাসে গিলতে থাকলে ঠিক আছে, কিন্তু চোখ ছোট করে ফেললেই মুশকিল; তখনই ধরা পড়ে যাবে অপরাধের ধরন, কারণ, পারিপার্শ্বিকতা, যুক্তি, মোটিভ ও সম্ভাব্যতা বিষয়ে যাবতীয় অসঙ্গতি। কয়েক জায়গায় ‘পাঠকের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে যে’ গোছের যে আদি বঙ্কিমী ধাঁচ অবলম্বন করে কাহিনির আধুনিকতায় হাস্যকর প্রলেপ দিয়ে ফেলেছেন। মধুজা সেনের শরীরে একটু বেশিই ঘুরেছেন এবং সম্পূর্ণ অকারণে মধুজা বাড়ি ঢুকে তার অন্তর্বাসদুটি কীভাবে খুলে ফেলছে অন্তত দু’বার তার বর্ণনা দিতে ভোলেননি। লেখক ইতিপূর্বে ছোটগল্পের মোড়কে লেখা প্রবন্ধগুলিতে তাঁর সুগভীর সাহিত্যজ্ঞানের যে পরিচয় দিয়েছেন তাতে তাঁর পত্রভারতীয় অনীশ-রঞ্জন গোত্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে বলে তো মনে হয় না।
.
তবে দেবতোষ দাশের লেখনীকে ওসব মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। যে নিপুণতায় তিনি কবিতার চাদরে একটি উপন্যাসকে সক্ষমভাবে জড়িয়েছেন, যেভাবে সংলাপ রচনা করেছেন, প্রাণপুরুষের সঙ্গে নিজের মনে মধুজার হাহাকার যেভাবে ব্যক্ত করেছেন, যেভাবে একটি সামান্য রহস্য-রোমাঞ্চ উপন্যাসকে কাব্যময়তার সুগভীরে নিয়ে গিয়ে যে অলীক আনন্দ দান করেছেন, কবিতাকে পাঠকের আরও কাছের ও নিজের করে তুলেছেন তার জন্য সাত ভুল মাফ হতেই পারে। উপরি পাওনা হিসেবে যেভাবে মহিলাদের বিচিত্র সব সাজপোশাকের উল্লেখ তিনি করে গিয়েছেন একের পর এক তাতে কোনও মহিলারও নিজের ফ্যাশনধারণা সম্পর্কে লজ্জিত হওয়া আশ্চর্যের নয়।
.
উপন্যাসটি হয়তো একবার, কিন্তু বহু শব্দ বার বার পড়ার মতো। তাই হয়তো একটি পেনসিল নিয়ে পড়তে বসাই বিচক্ষণতার পরিচায়ক।
.
পত্র ভারতীর চেনা ঝকঝকে পরিবেশনা প্রশংসাপ্রাপক। দেবযানী ঘোষালের প্রচ্ছদ ও অলংকরণও যথাযোগ্য।
.
প্রথম উপন্যাসের জন্য নবীন সাহিত্যিক দেবতোষ দাশকে আন্তরিক অভিনন্দন। সার্থক হোক আপনার কলমের প্রতিভা।
.
____________________

প্রবন্ধ : লওণ্ডা নাচ ~অভীক মুখার্জী



লওণ্ডা নাচ নিয়ে কিছু কথাঃ
কাল রাতে ‘সাবধান ইনডিয়া ইউ . পি. ফাইটস ব্যাক’ –এর একটি পর্বে দেখছিলাম ‘লওণ্ডা নাচ’ নামক পেশাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনার ব্যাপারে।
ছোট গল্প। ভানু নামের একটি ছেলে সদ্য সাবালক হবার পরে বাড়ির অভাবের তাড়নায় ‘নাচনিয়া’ (পুরুষ হয়েও মেয়েলি পোশাকের অন্তরালে থেকে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে অশ্রাব্য গানের তালে তালে নাচে যে) পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, প্রসঙ্গত উল্লেখ্য তার পিতাও এই পেশায় লিপ্ত ছিলেন। পিতাকে জোর করে রাজি করিয়ে এবং মাকে লুকিয়ে ছেলেটি খুব অল্প দিনের মধ্যেই লওণ্ডা নাচিয়ে হিসাবে বেশ নাম করে (ভানু হয়ে যায় ভানুপ্রিয়া) এবং ভালো টাকা রোজগার করতে থাকে। কিন্তু জীবন সোজা পথে এগোয় না। ডাক পড়ে এক স্থানীয় মুরুব্বির মেয়ের বিয়েতে নাচার জন্য। সেখানে নাচার সময় ছেলেপক্ষের একজনের নেকনজরে (!!!) পড়ে যায় ভানুপ্রিয়া, তাকে ৫০,০০০ টাকার নগদ ইনাম দেওয়া হয়। কিন্তু ইনাম প্রদানকারী কমবয়সী ছেলেটি বুঝে উঠতে পারেনা যে ভানুপ্রিয়া মেয়ে নয় ছেলে (এতই ভালো ছিল ভানুপ্রিয়ার অভিনয় আর নাচের দক্ষতা)। মেয়ে পক্ষের কিছু মানুষ ইনাম প্রদানকারী ছেলেটির সাথে কদর্য রসিকতার তালে ভানুপ্রিয়া’কে তুলে আনে রাতে ছেলেটির ঘরে (তাতে সাহায্য করে ভানুপ্রিয়ার নাচনিয়া দলের এক পুরানো নাচনিয়া, যে ভানুপ্রিয়ার ক্রমোন্নতি দেখে জ্বলে যাচ্ছিল)। ইনাম প্রদানকারী ভানুপ্রিয়া’কে বলাৎকার করতে গেলে প্রকাশিত হয়ে পড়ে ভানুপ্রিয়া আসলে ভানু। ভানু সেই মুহূর্তে পালিয়ে গেলেও ছেলে পক্ষের ইজ্জৎ নিয়ে মেয়ে পক্ষের মানুষ ‘খেলা’ করায় তার মাসুল দিতে হয় ভানুর প্রাণ দিয়ে। পরে এই গল্পে (সত্য ঘটনা) পুলিশের সাহায্য নিয়ে অপরাধী ধরা পড়ে।
ওপরের যে কাহিনী বিবৃত করলাম এরকম রোজকার জীবনে ঘটে থাকে ভারতীয় গো – বলয় এর Eastern U.P. , Bihar ইত্যাদি অঞ্চলে। লওণ্ডা নাচ এখানে খুব সাধারণ ব্যাপার। প্রায় মাস ছয়েক আগে থেকে এই নিয়ে পড়া, তথ্য খোঁজার কাজ শুরু করেছিলাম, কিছু পেয়েওছি। কি অদ্ভুত জীবন এদের সেটা না পড়লে, না দেখলে বোঝা যাবে না। মনে হয় আমরা শুয়ে আছি, না ঘুমানোর কথা বলিনি, বললাম শুয়ে আছি। যে অর্থে শুয়ে থাকা তা হল নিজেদের গা বাঁচানো, যেমন মানুষ বাঁচায় বোমার আঘাত, গুলির আঘাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে, আমরা জেনেও চুপ করে থাকি।
সামান্য কিছু অর্থের চাহিদায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অন্ধ্র, ওড়িশা থেকে কম বয়সী ছেলেরা উপরোক্ত অঞ্চলে ভিড় জমায় ‘নাচনিয়া’ হবার তাগিদে। এর মধ্যে প্রভেদ থাকে; কেউ শুধুই টাকার জন্য মেয়ের পোশাকে নাচে, কেউ মেয়েলি স্বভাবের তাই এই পেশা বেছে নেশার সাথে মিশিয়ে নেয়, অনেকে আবার নিজের লিঙ্গ কর্তন (লিকম ছিবড়ানো, লিকম= লিঙ্গ) করিয়ে হিজড়াদের খোলিতে নাম লিখিয়ে এই পেশায় আসে।
ভারতীয় গো – বলয় এর Eastern U.P. , Bihar ইত্যাদি অঞ্চলে বিয়ের বরযাত্রী বা ‘বারাতি’ এলে তাঁদের নেচে ‘স্বোয়াগত’ করতে / ‘বারাতি’র দলের সামনে নেচে নেচে আসার জন্য লওণ্ডা নাচিয়েদের দরকার হয়। ইতিহাস বলছে প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই প্রথার প্রচলন। মেয়েদের পর্দানশীন হবার কারণে ছেলেরাই এই পেশায় নাম লেখায়, তাছাড়াও মূলস্রোত ব্যতীত হিজড়া সমাজের মানুষ এতে অংশ নেন।
নাচ চলতে থাকে, রাত বাড়তে থাকে। মদের ফোয়ারার ছটকানিতে বারাতির দল ভুলে যায় নাচনিয়াদের লিঙ্গ (অবশ্য বিকৃত কাম লিঙ্গ ভেদ দিয়ে বিচার করা মূর্খের কাজ, যে বিকৃত কামের অধিকারী সেই ব্যক্তি সমাজের গায়ে একটা ঘা’য়ের মতই, নারী জাতির অবমাননাকারী প্রত্যেক মানুষ এই বিকৃত কামের অধিকারী ) , তাদের নিয়ে টানাটানি বাড়তে থাকে, নাচের রঙ্গে নেশা ধরাতে নাচনিয়ার দল যে পিঠের বেশি ভাগ খোলা ‘চোলি’ পড়ে থাকে সেই উম্মুক্ত পিঠে পড়তে থাকে পুরুষের হাত, ‘বন্ডেজ’প্রিয় বারাতির ব্লেড ছিন্ন ভিন্ন করে নাচনিয়া লওণ্ডার দেহ, রক্তে – স্বেদে দুর্দমনীয় পৌরুষ এর পরে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায় লওণ্ডা নাচের নায়িকাদের (নায়ক!!!)। এক নয়, দুই নয় বেশি ভাগ ক্ষেত্রে ১২-১৪ জনের হাতে ধর্ষিত হতে হয়েছে বলেই গড়পড়তা হিসাব মেলে।
তবে শুধু বারাতির বরাত নিয়ে নাচা নয়, কিছু ক্ষেত্রে মেলায়, অনুষ্ঠানে নাচার জন্যেও নাচনিয়াদের ব্যবস্থা করা হয়। নাচনিয়া খোলির মালিক এসব ব্যাপার দেখে থাকেন। আবার অনেক সময় রহিস জমিনদার দের বাড়িতে পাকাপাকি নাচনিয়াকে ক্রীতদাসের (ক্রীতদাসী!!!) মত রাখা হয়। ক্রীতদাস বলা বোধ হয় ভুল হবে, বলা যেতে পারে যৌনদাস হিসাবে। সেখানে কিছুটা খেতে পাবার জন্য বার বার তাকে ধর্ষিত হতে হয় জমিনদার, তার পরিজন, চাকর এদের হাতে; এমনকি প্রাতক্রিয়া সারতে মাঠে গেলেও শিকার হতে হয় এদের। কি অদ্ভুত লাগছে না! তার থেকেও বেশি গা – শিউরে ওঠা ভাব আসছে না! কিন্তু কিছু করার নেই লওণ্ডা নাচের নায়ক (!!!)দের। শেষ অব্দি বেশি ভাগ ক্ষেত্রে কোন দুরারোগ্য যৌন ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে স্থান হয় রাস্তার ধারে, জীবনের শেষের ওখানেই শুরু হয়।
ঋণস্বীকারঃ 
১. গুরুচণ্ডালী ওয়েবম্যাগ
২. ‘চন্দ্রগ্রহণ’ পত্রিকার ১৪২১ শারদ সংখ্যা
৩. ইন্টারনেট থেকে নানা সংকলিত তথ্য
৪. নিজস্ব গদাসম দৃষ্টিভঙ্গী

Tuesday, 23 June 2015

পুস্তক পর্যালোচনা ~অরিন্দম চক্রবর্তী




অরিন্দম চক্রবর্তীর পুস্তক পর্যালোচনা:-
নাম : অন্য থেকে ভিন্ন
লেখক : রঞ্জন বন্ধ্যোপাধ্যায়
প্রকাশকঃ সাহিত্যম
প্রিয়,
লিজা।আজ মনে পড়ছে সেই জ্যোৎস্না ভেজা রাতের কথা।যেদিন তোমার আমার শরীর জেগে উঠেছিল অন্তহীন ভালবাসায়।
কদিন ধরেই আমার মধ্যে পেয়ে বসেছিল মৃত্যুচেতনা।ভাবছিলাম কী হবে বেঁচে থেকে এই "অপ্রণয়"ভরা সংসারে।কাজকর্মের জটিল নাগপাশ আর অন্তহীন নির্লজ্জতা বারবার চেতনায় আনছিল 'বিপন্ন বিস্ময়'এর মরা সোঁতা।ঠিক তখনই তোমার টেক্সট মেসেজ।আমার চেতনার শিরায় ধরালো স্ফুলিঙ্গ।সেদিন টা ছিল পূর্ণিমা।দামিনীর মত ভাবছিলাম এমন দিনেই মরতে চাই হঠাত ই মোড় ঘুরল।জীবনের আরো একটু বাঁকে মধুলোভীর মত তোমার বাড়ির সামনে গাড়িটা থামালাম।
তুমি সেদিন পরেছিলে সাদা নাইটি।স্বচ্ছ ভেজা আবরণের মধ্যে দিয়ে তোমার দেহের উপত্যকা গুলো আমার শরীর মনে জেগে আনলে ঝড়।সাদা জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে চারপাশ।মনে পড়ছে এমন চন্দ্রালোকিত রাতের সৌন্দর্য দেখেই কবি রবীন্দ্রনাথ ভুলেছিলেন পুত্রশোকের নিদারুণ আর্তি।জীবনের টান এমন ই কী বিচিত্র!!!
সেদিন তুমি সরাসরি মেলে ধরলে নিজেকে।তোমার গোলাপি অন্তরবাসে যেন কবিতার মায়াঞ্জন।তোমার নেত্রছায়ার কালো নজরটানে আমি বিদ্ধ হলাম।ধীরে ধীরে পোশাক উন্মোচন যেন লাল পদ্মের পাপড়ি উন্মোচন।ঠিক এভাবেই কী পার্বতী পদ্মের কোরক কে উন্মুচিত করেছিল কুমারসম্ভবে??
তোমার নগ্ন শরীরের উথ্থানপতন আমাকে মনে পড়ালো নেরুদার প্রেমের আর্তি:::
"From your hips to your feet
I want to make a long journey.
I am smaller than an insect.
I go along these hills,
they are the colour of oats,
they have slender tracks
that only I know....

Here is a mountain.
I'll never get out of it.
Oh what giant moss!
And a crater,a rose
of dampened fire!"

সত্যিই তাই একটুও বাড়িয়ে বলছিনা।তোমার বিভাজিকার পরশ,ফুলের পাপড়ির মত বর্তুল স্তনবৃন্ত আর ভেজা গহ্বরের অমোঘ আকর্ষণ আমায় পাগল করে তুললে।গাঢ় চকোর মিশ্রণ তোমার সারা গায়ে ফেলে সেগুলো পরম মমতায় লেহন করতে লাগলাম।এক বন্য ফুলের সুগন্ধ পেতে লাগলাম আমি।আমার নগ্ন শরীর ক্রমশ তোমার সঙ্গে এক হতে লাগল।চাঁদের আলোর শিহরণ ঘাম চকো আর বীর্যের ককটেলে শোভিত হয়ে উঠল আমাদের মিলন লগ্ন তোমার স্টাডি।মনে হল আমি যেন স্বর্গের সেই অলকা পুরীতে রয়েছি।মৃত্যুর পাশ কেটে জীবনের এমন আততি আমায় ত্রাণ করতে লাগল।
সেই স্বর্গীয় অনুভূতির পরে যখন জীবন টাকে মনে হচ্ছে গলানো মোমের মত ঠিক তখনি তুমি আমায় এই বইটা এনে দিলে।এর প্রতিটা পাতায় তোমার সিডাকশনের মায়া আর ছেনালি ছড়ানো।
আজ আমি তোমার থেকে অনেক দূরে এই বইটা সবে শেষ করলাম।সত্যিই যৌনতার এমন বর্ণিল মহোৎসব তুমি আর রঞ্জন বাবু ই পারেন।এই বইয়ের এক একটি লেখা যেন তোমার পোশাক খোলার অদ্ভুত দুষ্টুমি।প্রতিটি শব্দ যেন তোমার নিরাবরণের ভাষা।এক একটা কাহিনিতে রয়েছে তোমার লাল বা গোলাপি অন্তর্বাসের সুবাস।তাই তো তোমার থেকে এত দূরে থেকেও এই বইয়ের গন্ধ যেন তোমার কথাই মনে পড়াচ্ছে।এই বইয়ের কুশীলবরা সবাই শরীরকে ভালবাসে সে পদ্মিণী থেকে রাজপুত কন্যা থেকে বিল ক্লিন্টন থেকে কেনেডি সবাই।লাবণ্য র শরীর ভাষা বুঝতে পারেনি অমিত।কিন্তু আমি বুঝেছি শরীরের ভালবাসার তন্ময়তাই পারে হিরণ্ময় জীবনের স্বাদ এনে দিতে।যেমন তুমি সেদিন মৃত্যুর পথ থেকে মোড় ঘুরিয়েছিলে জীবনের দিকে।আমি তো শেষ হতেই বসেছিলুম।কিন্তু তোমার আশ্লেষ আর এ বইয়ের প্রাণন আমায় বাঁচিয়ে রাখবে অনেকদিন।
হয়ত এরপরে অনেকের সঙ্গেই তোমার শরীরের সংযোগ ঘটবে কিন্তু তবুও ইয়েটসের কথা ধরে বলব:::"তোমার জীবনে অনেক পুরুষই আসবে।তারা তোমাকে ভালবাসবে।কিন্তু মনে রেখো,শুধুমাত্র একজনই ভালোবেসেছিল তোমার তীর্থযাত্রী আত্মাকে।"::::

Monday, 22 June 2015

পুস্তক পর্যালোচনা ~ রূদ্র সেন-

পুস্তক পর্যালোচনা ~ রূদ্র সেন-
The murder of Tutankhamen
Bob Brier, Ph.D.
Berkley Books, New York,
Price: ₹850/-
সুরম্য প্রাসাদে বিশ্রামরত এক কিশোর সম্রাট। স্তিমিত প্রদীপের নরম আলো যেন তাঁকে আরামের ঘুমের কোলে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ যেন একটা ছন্দপতন হল, ঘরে যেন কার পদচারণের শব্দ! উঠে দেখতেই মাথার পেছনে একটা ছুঁচালো অস্ত্রের আঘাত আর তীব্র রক্তপাত। ততক্ষনে অবশ্য আততায়ী পলায়ন করেছে কিন্তু সম্রাটের চিৎকারে ছুটে এসেছে তাঁর প্রিয়তমা রানী আর রক্ষীরা। তারপরে কয়েকদিনে সেরা চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমকে ব্যর্থ করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর পরে ঢলে পড়া। এই ছিল সেই হতভাগ্য কিশোরের ভাগ্যে, এক মর্মান্তিক মৃত্যু।

নতুন করে বলতে নিশ্চই হবে না, সেই কিশোর কে আর কে ই বা হল তাঁর প্রিয়তমা মহিষী। তাঁরা হলেন ফারাও তুতানখামুন আর রানী অ্যানকাসানামুন। এভাবেই প্রায় ৩,৫০০ বছর পরে সেই প্রাচীন হত্যাকাণ্ডের (?) সমাধান করতে নেমে বব ব্রায়ার বিভিন্ন ঘটনা সাজিয়েছেন। যদিও মৃত্যুর পরের ঘটনা আরো চাঞ্চল্যকর। রানী অ্যানকাসানামুন বুঝতে পেরেছিলেন হত্যা কাদের চক্রান্তে সংগঠিত হয়েছে তাই তিনি অবিশ্বাস্যভাবে মিশরীয়দের প্রাচীন শত্রু হিটাইট সম্রাটকে গোপন চিঠি পাঠালেন তার কোন রাজকুমারকে পাঠাতে, যেন অ্যানকাসানামুন তাকে বিয়ে করে মিশরের নতুন ফ্যারাওয়ের রানী হতে পারেন। এই চিঠি বর্তমান তুরস্কের রাজঅন্দরে আলোড়ন তুলেছিল, যে মিশরকে তারা কিছুতেই দখল করতে পারেনি, সেখান থেকে এমন প্রস্তাব! 

যদিও অ্যানকাসানামুনের এই আবেদন ছিল কাতর, পেছনে ছিল না কোন খারাপ অভিসন্ধি। সে শুধু চেয়েছিল প্রধানমন্ত্রী আঈ য়ের স্ত্রী হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে। ততদিনে তুতানখামুনের কোন সন্তানের জন্ম হয়নি তাই মৃত ফ্যারাওয়ের রানীকে বিবাহ করলেই নতুন ফ্যারাও হওয়া যাবে। কিন্তু রাজরক্তের অধিকারী নয় এমন কোন পুরুষকে তিনি বিবাহ করতে চান নি, তাই শত্রুর কাছে পাঠিয়েছিলেন এমন অদ্ভুত প্রস্তাব। যদিও প্রস্তাবে সাড়া দিতে আসা রাজকুমারকে পথে হত্যা করা হয়েছিল। 

এমন অদ্ভুত কিছু প্রাচীন ঘটনা আর প্রধানমন্ত্রী আঈ ও সেনাপতি হরেমহেবের চক্রান্তের শিকার এই রাজযুগলের মৃত্যু এবং পরিকল্পিতভাবে তুতানখামুনকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টার কাহিনী নিয়ে এই বই। 

যদিও ১৯২২ এ তুতানখামুনকে খুঁজে পাওয়া যায় কিন্তু তাঁর রানী অ্যানকাসানামুন ছিল তখনও অধরা। প্রখ্যাত ঈজিপ্টোলজিস্ট বব ব্রায়ার জটিল সেই রাজনৈতিক সমীকরন যার জন্য খুন হতে হয়েছিল সেই এই কিশোর ফ্যারাওকে আর মৃত্যুপরবর্তী বিভিন্ন ঘটনাকে গোয়েন্দার মতো সমাধান করেছেন প্রায় ৩,৫০০ বছর পরে আর শেষে তিনি এটাও স্বীকার করেছেন গোয়েন্দার কখনও পক্ষ নেওয়া উচিত নয় কিন্তু এই কিশোরকে তিনি ভালবেসে ফেলেছিলেন। তাই সেই ভালবাসা সব বাধাকে অতিক্রম করে মনে হয় সেই হতভাগ্য ফ্যারাওকে তাঁর হত্যার প্রকৃত হত্যকারীকে চেনাতে পেরেছেন প্রায় ৩০ শতাব্দী পরে।।

Sunday, 21 June 2015

ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না ~ অভীক মুখার্জী

ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না ~ অভীক মুখার্জী 
-----------------------------------
ফেব্রুয়ারির হাওয়া জানান দিচ্ছে গরম আসতে খুব দেরি আর নেই; নরেশের দোকানের শিঙাড়ায় ফুলকপি কমে যাবে, কাঁচের শিশিতে জমে যাওয়া নারকোল তেল আর গলিয়ে মাখতে হবে না, ছোট জলাগুলো শুকোতে থাকবে; ঐ যে বললাম, গরম আসতে খুব দেরি আর নেই।
আমার আকাশ – বাতাস চমকানো ঈশ্বর – পৃথিবী – ভালবাসা মাথায় নিয়ে কৃষ্ণরামপুর বাজার থেকে হেঁটে যাচ্ছি বদরতলার দিকে, চোখে পড়ল একটা চেনা চেনা মানুষ। মানুষটা চেনা নাকি বলা মুশকিল হলফ করে, চেনা হলে তো একবারেই চিনে ফেলতাম; অচেনাও নয় তাহলে চিনতে চেষ্টাই করত না আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্ক।
উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা একটা অবয়বকে খুব দ্রুত মাথার ভিতরে সার্চ করে বেরাচ্ছি, যাতে চিনে নিয়ে কিছু একটা বলতে পারি, কারণ চোখের সামনে দেখছি যিনি আসছেন আমার উলটো দিক থেকে তিনি আমার দিকে স্মিত হাস্য পাত করেই আছেন।
এই আমার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, এতেই আমি আস্থা রাখি, ঐ বয়সের কেউ আমার স্যার না হলেও স্যার বলে ডাকতে কাউকেই দোষ হয় না, স্যার মানে মহাশয়, মানে স্যার ডাকে সবাইকেই সইয়ে দেওয়া যায়।
-স্যার ভাল আছেন?
-চিনতে পারলে তবে?
-হ্যাঁ স্যার, আপনাকে চিনব না! সেকি কথা!
-না, এখন আমি অনেককে চিনতে পারি না তো, বয়স হয়ে গিয়ে নার্ভগুলো আর কাজ করে না। ঐ যে অলফ্যাকটরি নার্ভের কি একটা প্রবলেম বলেছিল সচিন ডাক্তার... মমমমম... মনে পড়ছে না।
মনে পড়ে গেছে ততক্ষণে আমার, রবিন বাবু, রবিন হালদার, আমাদের, মানে আমার মাধ্যমিকের টিউশনের বিজ্ঞান টিচার, রবিন বাবু। সামান্য একটা অলফ্যাকটরি নার্ভের উল্লেখ আমাকে মনে করিয়ে দিল বিজ্ঞান স্যারের কথা, নাহলে মনেই করতে পারছিলাম না। যেন এক দশকে পেরিয়ে গেছেন অর্ধ শতক। সেই চোখের দীপ্তি, মুখের লালিমা, প্রশস্ত বপু সব কালের কপোলে নোনা জলের ধারার মত হারিয়ে গেছে; ঘোলাটে চোখ, তামাটে মুখ, কোলকুঁজো দেহ নিয়ে রবিন স্যারের সেই পুরানো ছবি ইতিহাসের মত লাগল আমার মনের কোনও এক কোঠায়। যেমন কুষাণ সম্রাট কনিস্কের স্কন্ধ কাটা মূর্তির ছবি দেখেছি জীবন মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস বইতে, ঠিক তেমনি আমার বিজ্ঞান স্যার দাঁড়িয়ে আমার সামনে।
- এইরে একটা ভুল করে ফেলেছি মনে হচ্ছে, অলফ্যাকটরি নার্ভের কথা বললাম কিনা! ওটা বোধ হয় ঘ্রাণের কাজে লাগে, মনে নেই কিসে মনে থাকার কাজ হয়। মনে পড়ছে না। তোমার নামটাও মনে পড়ছে না, কিছু মনে কর না, খুব চেনা লাগল তোমাকে তাই দাঁড় করিয়ে দিলাম আর কি। নামটা যেন কী.... মমমম....অরিন্দম?
- না স্যার আমি মৃদুল; ২০০৫ সালের মাধ্যমিক ব্যাচ। মনে পড়ছে?
- না এখন তেমন মনে পড়ে না। অনেককেই চিনতে পারি না বললাম যে, অনেকে আমাকেও চিনতে পারে না।
দেখছ তো কি হাল আমার। আমি তো স্কুলের মাস্টার নই যে পেনসন মিলবে! টিউশন করতে পারি না এখন, ঐ যে কিচ্ছু মনে থাকে না, পড়াব কি! ভুল হয়ে যাচ্ছিল, ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলতে হলে নেতা হতে হত, কোনও স্যার কি তার ছাত্র – ছাত্রীর নেতা হতে পারে নাকি?
এখন সবাই আমাকে দেখলে ভয় পায়, সরে যায়, কথা বলে না, যদি আমি ধার চাই।
বুঝলাম রবিন স্যার এখন সমাজে ব্রাত্য।
- তা তোমাকে তো অনেকদিন দেখিনি, থাকো কোথায়?
- চাকরি করি স্যার। মুর্শিদাবাদে থাকি। ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট।
- তাই নাকি! এটা জানতাম না তো!
বলতে গেলাম, ‘সেকি স্যার সবাই তো জানে’। পারলাম না, থামতে বাধ্য হলাম, টের পেলাম আমি এমন কিছু হাতি ঘোড়া বশ মানাইনি যে তার জন্য আমাকে এক ডাকে চিনতে হবে।
- তা ভালো। মুর্শিদাবাদ ভালো জায়গা। ঐতিহাসিক স্থান। আমি বিজ্ঞান পড়াতাম বটে, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে প্রচুর পড়তাম। এখন আর পড়ি না, মনে রাখতে পারি না। তা ঘুরে দেখলে বাচ্ছাওয়ালি কামান, সিরাজের খাবার প্লেট, আজিমুন্নেসার কবর? দেখলে... দেখলে....মমমম....?
ইতিহাস নিয়ে ব্যস্ত আমার বিজ্ঞান স্যারকে ফিরতি উত্তরে বলব কেমন করে যে আমার ঐসবে উত্সাহ নেই। ভাবছি যে কেনই দেখা হল, একটা খ্যাপাটে লোক রাস্তায় বেশ উত্তেজিত ভাবে আমাকে প্রশ্ন করছে দেখে অনেক চেনা অচেনা মানুষ দেখছে।
- না স্যার দেখা হয়নি, দেখে নেব, সময় হলেই দেখে নেব।আসলে কাজের খুব চাপ জানেন তো। ছুটির দিনে গিয়ে দেখে নেব।
বিশ্বাস করুন আমি অমন জ্বলন্ত অথচ করুণ দৃষ্টি কোনও দিন দেখিনি। এক পাত্রে আগুন আর জল দুটো সহাবস্থান করানো সম্ভব হলে যেমন দেখাত ঠিক তেমনি লাগল স্যারের চোখ।
- তুমি জানো কি, History has no holiday? তেমনি জেনে রাখো, ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না।
রবিন স্যার আর দাঁড়ালেন না, অসীম বিরক্তি, অদ্ভুত রাগ নিয়ে জায়গা ছেড়ে হাঁটা দিলেন।
আমি কিঞ্চিত স্তম্ভিত, হতভম্ব।
স্থাণুবৎ দণ্ডায়মান আমি। পাশের ওল্ড বেনারস রোড ধরে ছুটে যাচ্ছে ধর্মতলা – গড়েরঘাট রুটের বাস, মহীনের চায়ের দোকানে টুংটাং শব্দের জিগির তুলে কাঁচের গেলাসে চিনির বিয়ে গরম জলের সাথে, অনুপম রায় গাইছে 98.3 FM Radio তে, ‘বসন্ত এসে গেছে...’।
মাথায় একটা কথাই ভাসছে, ‘ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না’।

Saturday, 20 June 2015

পুস্তক পর্যালোচনা~ সোহম দাস:-

সোহম দাসের পুস্তক পর্যালোচনাঃ-
নাম : কিশোর রচনাসংগ্রহ
লেখক : মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রকাশকঃ আনন্দ পাবলিশার্স
পরিসংখ্যানবিদ ও অর্থনীতিবিদ মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র । রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের লেখকদের মধ্যে অন্যতম মোহনলাল কিশোর-সাহিত্যে তাঁর মুন্সিয়ানা দেখিয়েছিলেন নিপুণভাবে । তাঁর কিশোর-কাহিনীগুলি শুধু কিশোর নয়, যুবা, প্রবীণদেরও যে মন ভালো করে দেবে সেটা এই বইটি একবার পড়লেই বোঝা যাবে । “বোর্ডিং স্কুল” ও “বাবুইয়ের অ্যাডভেঞ্চার” উপন্যাস দুটি এক কথায় অসাধারণ । দুটি উপন্যাসেরই নায়ক দুটি কিশোর । তাদের চোখ দিয়ে দেখানো তাদের খুদে জগতটাকে তিনি যেভাবে দেখিয়েছেন, তাতে লেখক হিসেবে তিনি কতখানি দক্ষ তার পরিচয় তিনি দিয়েছেন । “বোর্ডিং স্কুল”-এর নবাগত ছাত্রটি অন্যান্য ছাত্র-শিক্ষকদের কাছে যেমন পরিহাসের পাত্র হয়ে ওঠে তেমন অনেকেই তাকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাছে টেনে নেয় । কিন্তু অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে সেইসব আপনজনেরা তাকে ছেড়ে চলে যায় কোনও না কোনও ভাবে । ভালো-খারাপের দোলাচলে অতিবাহিত হতে থাকে তার স্কুলজীবন । পড়লে পাঠকের চোখে জল আসতে বাধ্য । “বাবুইয়ের অ্যাডভেঞ্চার” আবার অনেকটাই অন্যরকম । বলা যেতে পারে, অনেকটাই অনুপ্রেরণামূলক । কিশোর বাবুই “আজবতত্ত্ব” নামের এক কিশোর-পত্রিকায় দেশ বিদেশের নানা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হত এবং সে নিজেই তার মত করে অ্যাডভেঞ্চারে বেড়িয়ে পড়ত । সেগুলি পড়লে হয়তো পাগলামো মনে হবে কিন্তু এটাই তো কৈশোর । এই পাগলামো না থাকলে আর কৈশোরের মজা কোথায় । কিন্তু বাবুই পরবর্তীকালে সত্যি সত্যিই এক দুর্ধর্ষ অ্যাডভেঞ্চার করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের হয়ে । যুদ্ধবিমান চালিয়ে সে জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে বোমাবর্ষণ করত । তারপর অবশ্য ধরা পড়ে যায় । তারপর যুদ্ধ শেষ হলে সে একজন মুক্ত ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে ব্যবসা শুরু করে ও শেষে দেশে ফিরে আসে । তাও সে তার ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ভুলতে পারে না । আজবতত্ত্ব কোলে নিয়ে ছাদের কোণে বসে পড়ে বিভোর হয়ে যাওয়ার দিনগুলো । এছাড়া এই সংকলনে ২৯টি নানা স্বাদের গল্প, ১৭টি মজার গল্প, দুটি নাটিকা, ৪টি বড়গল্প, ২টি ভূতের গল্প, ১৪টি রূপকথা, স্মৃতিকথা ইত্যাদি স্থান পেয়েছে । রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা “কত্তাবাবা” আর লেখক-শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে “বড় দাদামশাইয়ের কথা” ঠাকুরবাড়ির শিল্প-সংস্কৃতির কথা যেমন বলে তেমন পারস্পরিক হৃদ্যতার কথাও সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন তাছাড়া উঠে এসেছে নানা অজানা তথ্যও । যতই ভারী ভারী গম্ভীর বই পড়ি না কেন, মাঝে মাঝে স্বাদ বদলের জন্য এরকম বইয়ের খুব প্রয়োজন আছে, একেবারে মন ভালো করে দেওয়া বই । তাই কিনতেই পারেন আনন্দ পাবলিশার্সের এই অনবদ্য সংকলন । দাম মাত্র ১৭৫ টাকা ।

|| অপরাহ্ন || ~ স্পর্শের বাইরে

                      



আমি সাধারণত সামাজিক,অভিজ্ঞতালব্ধ গল্প লেখার চেষ্টা করি। কাল রাতে অলৌকিক গল্প লিখতে গিয়ে দেখলাম,, ব্যাপারটা বেশ কঠিন !
|| অপরাহ্ন ||
_______________

আমার ডাক নাম শর্মি। তবে ও আমাকে 'সু' বলে ডাকতো।
কি সুন্দর এক অক্ষরের মিষ্টি নাম না ! মাঝে মাঝে ও যখন আমাকে সু বলে ডাকতো,তখন মনে হত এর থেকে ভাল এক অক্ষরের নাম হয়ত পৃথিবীতে আর একটাও নেই।
আমি যখন পার্কে বা রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতাম,তখন ও পেছন থেকে এসে হঠাত করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরতো। কোন তরুনীকে যদি হঠাত তার প্রেমিক ভালোবেসে চুপিচুপি পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে,,তখন সে খুব তৃপ্তি পায়। ওর এই পাগলামিতে আমিও ভিষন খুশি হতাম। মনে মনে খিলখিল করে হেসে উঠতাম। কিন্তু ওকে বুঝতে দিতাম না। গম্ভীর গলায় বলতাম - "রাস্তাঘাটে এসব অসভ্যতা আমি পছন্দ করি না"।
ওর মুখটা যখন করুন হয়ে যেত,,আমি তখন হেসে হেসে ওর মাথার একঝাক চুল এলোমেলো করে দেবার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সবসময় পারতাম না। ও খুব লম্বা ছিল।
বিকেলের এই সময়টা আমার খুব ভাল লাগে। সূর্য মাথা নুইয়ে নেয়,এদিকে অন্ধকারের ছিটেফোঁটাও থাকে না। এই সময়টাকে খুব সুন্দর ভাষায় কি যেন বলে?? অপরাহ্ন।
আচ্ছা আপনি কখনো ঠকেছেন?? ভালোবাসায় ঠকেছেন?? আপনার কাছের মানুষ'টা যার সাথে সারাটা জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন,,সে হঠাত করে আপনাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দূরে সরিয়ে দিয়েছে??? তখন ঠিক কিরকম অনুভব করেন???
ভিষন রেগে যান?
কান্নাকাটি করে সারাক্ষন নিরবে গাল ভিজিয়ে রাখেন?
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তার কথাগুলো মনে পড়ে আর ঘুম আসতে চায় না?
তার পুরোনো ছবি'গুলি নষ্ট করেও স্মৃতির আয়নায় বারবার সাজিয়ে রাখেন?
তাকে অন্য কারও জীবনে জড়িয়ে পড়তে দেখে মনে মনে দির্ঘনিশ্বাস ফেলেন বলেন,,'আমি আজও তোমায় ভালোবাসি'?
আর তারপর বুক দাপড়িয়ে নিজেকে সান্তনা দিয়ে বলেন,,'এখনও অনেকদিন পড়ে আছে'?
তারপর একসময় স্মৃতিপট গুলো মনের খুব গভিরে ধামাচাপা দিয়ে ভব্যিষতের জন্য প্রস্তুতি নেন?
এর মধ্যে কোনটা? যেটাই হোক,আপনি নিজেও জানেন না এই পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের থেকে আপনি অনেক ভালো আছেন। অনেক সুখে আছেন।
আজ বিকেলে আমার এই ছোট্ট এককামড়ার ঘর'টায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাত করে খাটের কোনায় এই ডায়েরি'টা চোখে পড়লো। আমি ক্লাস ১২ অবধি পড়েছি। লেখাপড়া জানি। তাই ডায়েরি পৃষ্টা উল্টিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করলো। আমি কোনোদিনও সেভাবে কিছু লিখিনি,তাই আমার কাছে ইচ্ছাটা খুব লজ্জার। ঠিক যেমন ১৪ বছরের কিশোর ঠোটের উপর কালো রেখার অস্তিত্ব দেখে লজ্জা অনুভব করে।
আমি খুব দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। আমরা ৫ বোন। কোন ভাই নেই যে ভবিষ্যতে বাবার শিরদাঁড়া'র অবলম্বন হয়ে উঠবে। বাবা হাড়-ভাঙা খাটুনি খেটে আমাদের মানুষ করেছে।
আমি তখন আমার জীবনের প্রথম প্রেমে পড়ার আনন্দে মশগুল। ছেলেটাকে প্রথম দেখায় কিভাবে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম জানিনা।
একদিন হঠাত বাড়ি থেকে পালাম। যদিও পালানোর কোন প্রয়োজন ছিল না। বাবা-মা'র ঘাড় থেকে একটা মেয়ে নেমে গেল ভেবে হয়ত এমনিই ছেড়ে দিত। তবুও 'ও' বললো হঠাত করে বিয়ে সেরে ফেলতে।
যাকে মন থেকে বিশ্বাস করে ভালোবাসা যায়,তার হাতে হাত রেখে মৃত্যুকে পর্যন্ত আপন করে নেওয়া যায়। সেই জায়গা থেকে পালানো'টা তো সামান্য কিছু।
আমার ভেজা ঠোটের দিকে তাকিয়ে 'ও'র চোখ দুটো যখন ঝিকমিক করে উঠতো,তখন নিজেকে এই পৃথিবীর সবথেকে সুখি নারী বলে মনে হত।
জীবনের প্রথম চুম্বন কেউ ভোলেনা।
আমার আজও একটু একটু মনে পড়ে। ও'র সেই শরীরের ঘ্রান,উদ্দিপনা,ঘামে ভেজা চকচকে সুঠাম দেহ আমাকে মাতাল করে তুলতো। মাঝেমাঝে এই পুরুষ'টা একমাত্র আমার ভেবে নিজেকে কি ভিষন সৌভাগ্যবতী মনে হত!
দুজনে মিলে একদিন ঠিক করলাম,,একদিন স্বামী স্ত্রী হয়ে বাড়িতে গিয়ে বাবা-মা'র কাছে ক্ষমা চাইবো। তিন বোনের জন্য চুড়িদার,বড়'দি আর মায়ের জন্য দুটো ভাল তাঁতের শাড়ি,,,আর বাবার জন্য একটা নতুন দামী টেপরেকর্ডার কিনে নিয়ে যাব।
আমার বাবা খুব ভালো গান গাইতে পারে। সব তার নিজস্ব গান।
ছোটবেলায় আমরা ৫ বোন জেগে থাকতাম। রাতে খাওয়ার পর কখন বাবা কাঁঠাল গাছের তলায় শোয়ানো ভাঙা চৌকিটায় বসে গান ধরবে।
বাবা'র কোন গানের কথা মনে না থাকলেও সুর'গুলি আজও আমার মনে আছে। সুর লেখার উপায় জানা থাকলে আপনাদের লিখে শোনাতাম।
নতুন টেপরেকর্ডারের একটা সখ বাবা'র অনেকদিনের। যেটায় বাবা নিজের গান'গুলি ধরে রাখতে পারবে। আমাদের প্রত্যেকদিনের খাবারের চাহিদা'র কাছে সেই সখ কোনদিনও অম্লান হতে পারেনি।
ও যখন দীঘা'য় হানিমুনের কথা বললো তখন মন'টা আনন্দে মেতে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল,আমি এত সুখি কেন? দীঘা'য় আসার আগে দুজনে মিলে কেনাকেটা করতে বেড়িয়েছিলাম। মনে আছে সেদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। ও ভালোবেসে আমাকে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি কিনে দিয়েছিল। জিনিস'টার দাম সামান্য হলেও মনে হয়েছিল,এর থেলে মূল্যবান কোন উপহার কি এই পৃথিবী'তে আর একটাও হতে পারে!! বাদবাকি কেনাকাটা দীঘা'র জন্য রেখে দিয়েছিলাম,ঠিক যেমন ভালোবাসা'টুকু তুলে রেখেছিলাম সমুদ্রের ঢেউ এর জন্য।
ওর দেওয়া সেই লাল শাড়ি পরেই আমি জীবনে প্রথম ধর্ষিত হই।
হঠাত একদিন নিজেকে আবিষ্কার করি এই এককামড়ার ঘরে। ভালোবাসার আনন্দ প্রথম নথ ভাঙার প্রচন্ড কষ্টের কাছে হার মেনেছিল। দু'পা ভেষে গিয়েছিল রক্তে।
প্রথমে অনেক চিতকার করে বাইরের জগতের কাছে নিজের অস্তিত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। দু'দিন পরে বুঝলাম আমি নরকে এসে পড়েছি। এখানকার জগত বিষাক্ত ভালোবাসায় ভর্তি।
আমাকে সবসময় দরজা বন্ধ করে রাখা হত। এখনও হয়। আমি প্রচন্ড ভয়ে গুমরে থাকতাম। প্রথম প্রথম দরজা খোলার চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। পরে নিজেই ভয়ে থাকতাম যেন এই ঘরের দরজা কখনো না খোলে,,কারন দরজা খোলার সাথে সাথেই এক একজন করে উন্মত্ত,হিংশ্র পশু এই ঘরে ঢুকতো। ওরাও 'পুরুষ' এবং 'মানুষ' শ্রেনীর মধ্যে পড়ে। আমি অনেক ক্ষুদার্ত হায়েনা'র সামনে একদলা মাংশপিন্ড হয়ে উঠলাম।
যে ভালোবাসার জন্য একসময় ঘর ছেড়েছিলাম,,তারপর থেকে সেই ভালোবাসার ভয়েই এ ঘরে আটকা পড়ে রইলাম।
প্রথম দু'মাস দুরন্ত কষ্টের পরে একসময় যেন নিজের থেকেই মানিয়ে নিলাম। গলার থেকে নিচের অংশের কোন গুরুত্ব আমার কাছে রইল না। আমি তখনও বুঝিনি আমি এ ঘরে কিভাবে এলাম।
আমার এ ঘরে একটা জানালা ছিল। জং ধরা লোহা'র শক্ত জানালা। নাজানি কতদিন খোলা হয়নি। বহুদিনের প্রচন্ড চেষ্টার পর একদিন সেই জানালা খুললাম। আমার ঘরে প্রায় তিন'মাস পরে সূর্যের আলো এসে পড়লো। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম আমার ঘর'টা দোতলায়। নিচে কতো কতো মেয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায়েনা'দের সাথে দর কষাকষি করছে। আমি বুঝতে পারলাম,আমি কোথায় এসে পড়েছি। আরও দু'দিন পর বুঝতে পারলাম,আমাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই পৃথিবীতে সবজায়গায় একটা নির্দিষ্ট বাজার থাকে,,যেখানে নারী'রা বিক্রি হয়,, পুরুষ'রা কিছু সময়ের জন্য কেনে,সভ্যতা...সভ্যতার মত এগিয়ে যায় আমাদের মত কিছু কিছু মানুষ'কে অসভ্য তকমা'য় ভূষিত করে।
জানালা থেকে সেদিন ওকে দেখেছিলাম। আমার সেই প্রানের পুরুষ। সেই একমাথা ঝাঁকানো চুল নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে বয়স্ক একজন মহিলা'র সাথে কথা বলছে।
হঠাতই আমার সাথে ওর চোখাচোখি হল। ও কিছুটা ঘাবরে গেল। মুখটা থতমত হয়ে গেল। আমার দিকে আর না তাঁকিয়ে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে চলে গেল। ঠিক যেন পালিয়ে গেল।
কিজানি কেন ও'র ওপর আমার বিন্দুমাত্র রাগ হলো না। অথচ সেটাই হবার কথা ছিল। ইচ্ছা করছিল ওর থতমত করুন মুখের উপরের সেই একঝাক চুল ঘেঁটে এলোমেলো করে দি। কিন্তু পারতাম কি? ও যে ভিষন লম্বা!
কিন্তু রাগ আমার হলো। হলো কিছুদিন পর। ও'কে আমি ভিষন ভালোবেসে ছিলাম। ও আমাকে প্রত্যাক্ষান করতে পারতো। নাজানিয়ে অজ্ঞানবস্থায় এই বেশ্যালয়ে বিক্রি কেন করে দিল?? কত টাকা পেয়েছিল তাতে 'ও'? আমার ভালোবাসাস মূল্য দিয়ে সেই দাম মাপা গেলে,,,একবার মেপে দেখতাম।
আমি সারাদিন এই ঘরে খাটের উপর শুয়ে থাকতাম। এখনও থাকি। পশুগুলো যখন আমার দেহের উপর উন্মত্ত হয়ে উঠত,আমি উপরে ঘুরন্ত ফ্যান'টার দিকে একদৃষ্টে তাঁকিয়ে থাকতাম। ফ্যান'টা ঘুরতে ঘুরতে একসময় যেন হলুদ হয়ে যেত। কাঁদতে কাঁদতে একসময় যেমন মানুষের চোখের জল অজান্তে হলুদ হয়ে ওঠে। ফ্যান'টা সারাদিন ঘুরতো। যেন হাওয়া দিয়ে আমার সব বেদনা,কষ্ট উড়িয়ে নিতে চাইছে। ফ্যান'টাকে আমি ভালোবেসে ফেললাম।
একদিন জানালা'র শিঁক ভেঙে একটা চাকু'র মত বানালাম। তারপর জিনিস'টাকে খাটের পায়া'র একটা গর্তে লুকিয়ে রাখলাম।
যদি কখনো আমার সেই প্রানের পুরুষ আমার এই ঘরে আসে,ওর একঝাক চুলের মধ্যে ওটা পুঁতে দিয়ে বোঝাবো,,ওর মতো আমিও ভালোবাসতে পারি।
হ্যাঁ একদিন 'ও' আসলো। একদিন বিকেল। বহুদিন পর। জানিনা হয়ত ভুল করেই আমার ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। ওকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম,,,,ও অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে ইতস্তত করছিল।
আমি ওকে সে সুযোগ না দিয়ে আপন করে নিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম কেমন আছো?? বেঁচারা উত্তর দিতে পারেনি। হয়ত অবরাধ বোধে ভুগছিল।
ওকে কাছে টেনে নিয়ে আমরা আবার মিলিত হলাম।
একসময় ও যখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন,আমি ধীরে ধীরে খাঁট থেকে নামলাম। খাঁটের পায়ায় লুকিয়ে রাখা চাকু'টা বার করলাম। তারপর উঠে আসলাম উপরে। ওর একঝাক চুলের মধ্যে ওটা সজোরে আঘাত করতে প্রস্তুত হলাম।।
নাহ!! পারলাম না। আমি হেরে গেলাম। ভালোবাসার মানুষ যতই দুরে ঠেলে দিক না কেন! হয়ত তার উপর রাগ হয়,,,কিন্তু চেষ্টা করলেও তাঁকে কষ্ট দেওয়া যায় না। শুধু নিরব কিছু অভিমান বুঁকের ভিতরে আটকে থাকে,,যা সে কখনো ভাঙাতে আসে না।
লোহা'র চাকু'টা আবার আগের জায়গায় রেখে দিলাম।।
এখন আমি মাঝে মাঝে বাইরে বের হতে পারি। দিনের বেলা এরা বেড়াতে দেয় না। বিকেলের পর থেকে নিয়ম কিছুটা শিথিল হতে থাকে। বিকেলে যখন লাইন দিয়ে আমার বয়সী মেয়েগুলিকে রোজগারের আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি,তখন খুব মায়া হয়। আর রাতে যখন দেখি সারাদিনের রোজগারের টাকা দিয়ে বেশ আরাম করে, হাঁটু মুড়ে আসন করে বসে গ্রাস পাকিয়ে ধবধবে সাদা ভাত খাচ্ছে,তখন সেই দৃশ্যটাকে কোন অচেনা শিল্পির জল রঙে অাঁকা পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরতম চিত্র বলে মনে হয়।
এক মিনিটটট!!
কে যেন আসছে। হ্যাঁ মনে হয় এই ঘরের দিকেই। হয়ত আবার এক উন্মত্ত পুরুষ আসছে মাংসের লোভে। প্রায়ই মনে হয় এদের বাড়িতেও আমার মতো দিদি,বোন বা মেয়ে আছে,,ওই দু'টি কালো চোখে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য এরা খুঁজে পায়না কেন??? এখন নিজেকে সত্যিকারের মানুষের থেকে ভূত বলে বেশি ভ্রম হয়।
আওয়াজ'টা প্রায় ঘরের সামনে এসে পড়েছে। আমাকে থামতে হবে..............
অনেকদিনের বন্ধ দরজা'টা হঠাত বিকট শব্দ করে খুলে গেল। তার ভিতরে ছুড়ে ফেলা হল এক উনিশ-কুড়ি বছরের মেয়েকে।
প্রচন্ড ঝড়ের পর গাছপালা'গুলোর যে অবস্থা হয়,তার সাথে এই মুহূর্তে মেয়েটার মুখের বেশ মিল পাওয়া যাচ্ছে। সাথে বেশ সুপুরুষ প্রায় ২৬-২৭ বছরের একটি যুবকও ঘরের ভিতরে ঢুকলো।
মেয়েটা কাকুতিমিনতি করছে.......
- প্লিজ আমাকে যেতে দাও। আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম,ভালোবেসেছিলাম। আমার সাথে এরকম কেন করছ?
- ভালো তো আমি এখনও তোমাকে বাসি সোনা। শুধু তোমার ওই ভালোবাসা'টুকু আরওও অনেকের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে।
- ছি:! লজ্জা করে না তোমার?
- লজ্জা আবার কি?? খায় না মাথায় দেয়। বেশি চাপ নিও না ডার্লিং। তোমার লজ্জা কমানোর দায়িত্ব আজ থেকে আমি নিলাম। আজ থেকে তোমার নাম রুমি নয়,,রঙ্গিলা। হে হে হে..........
- প্লিজ আমাকে যেতে দাও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আমি ছাড়া আমার মা বাবা'র আর কেউ নেই।
- অবশ্যই যেতে দেব সোনা। এই মুহূর্তে তুমি ছাড়াও আমার আর কেউ নেই। দুবছর ওয়েট করো। টাকা'টুকু ভালোভাবে উসুল হোক। তোমার শরীরের দাম কত জান! অনেকেকেকক! তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমার তো ডার্লিং গর্ব হওয়া উচিত।
- শয়তান,,জানোয়ার,,ইতর! তুই কতদিন আটকে রাখবি? একদিন ঠিক বেড়াবো! তখন তোকে খুন করে নিজে মড়বো দেখে নিস!
- তাই নাকিইইইইই?? খুব সখ? বেড়ানোর কথা কল্পনাতেও এনো না। হাজার চিতকার করলেও এই ঘর থেকে কেউ বেড়াতে পারে না। এর আগে একজন ছিল। অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারেনি। শেষে উপরে ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। তবে ততদিনে মার্কেট ভ্যালু উসুল হয়ে গিয়েছিল। তারপর উপরের ওই ফ্যান'টাও খুলে নেওয়া হয়।
যা হোক,শেষবারের মত তোমাকে একটু ভোগ করে নি। কাছে এস রঙ্গিলা.......
মেয়েটা ছিটকে এসে যুবক'টার গালে একটা চড় মারল।
- তবে রে! এত বড় সাহস!.........
মেয়েটার পেটে এক লাথি মেরে খাঁটের পাশে মেঝের উপর শুইয়ে দেয় যুবক'টি। তারপর চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে মেয়েটার প্রতি ক্রমশ হিংশ্র হয়ে উঠতে থাকে।
মেয়ে'টা নিজেকে বাঁচানোর প্রানপন চেষ্টা করে,কিন্তু বারবার বার্থ হয়। ততক্ষণে যুবক'টি মেয়েটির শরীরের উপর চড়ে বসেছে।
মেয়েটি ঠিক যে মুহূর্তে আস্তে আস্তে শিথিল হতে থাকে,,,তখনই তার কানে কে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে 'পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'। প্রথমে মেয়েটি কিছু বুঝতে না পারলেও পরে আবার একই শব্দ ফিসফিস করে করে উচ্চারিত হতে থাকে... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'.... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও' ... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'..
মেয়েটা পায়া'র ধারে হাত দিতেই হাতে শক্ত মতো কিছু বাঁধল। সেটা দিয়ে সজোরে যুবক'টির গলার ধারে আঘাত করলো।
জানালা'র শিঁক দিয়ে বানানো পুরোনো কিন্তু ধাঁরালো চাকু'টা যুবক'টিকে মুহূর্তের মধ্যে প্রানহীন করে দিল। তার গলা রক্তে লাল হয়ে উঠতেই মেয়েটা উপরের দেহ'টাকে ঠেলে সরিয়ে ঘরের চারিদিকে তাঁকাল। কোথাও কেউ নেই। একপাশে শূন্য খাঁট,,মরচে ধরা জানালা,দূরে কোথাও একটা খাতার মতো পড়ে আছে।
এই সময় কন্ঠ'টা আবার প্রতিধ্বনিত হল.....'পালাও'.............'পালাও'........'পালাও'..
মেয়েটা ভয়ে কুকরে আছে। দু'টো চোখে জোর করে পড়ানো কাজল উপচে জল নেমে সারা মুখ কালো কালো হয়ে উঠেছে। সে জানেনা এটাই তার শেষ সুযোগ। সে জানেনা তার পালানোর মধ্যে দিয়েই এই অপরাহ্ন'এ আরও একজনের মুক্তি ঘটতে চলেছে।
(শেষ)