সুরঞ্জন মণ্ডলের চোখে কবি সুকান্ত ও বর্তমান সময় :~
.
সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন বাংলা সাহিত্যে মার্কসবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী একজন কবি। মার্কসবাদ কথার অর্থ হল সাম্যবাদ। মালিক বা বুর্জোয়া শ্রেনীর সাথে শোষিত, নিপীড়িত শ্রমিক শ্রেণীকে একসারিতে বসানোর মতবাদ হল সাম্যবাদ।
.
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৫ই আগস্ট। তিনি তার সময়কালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশের মম্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির প্রভাব স্বচক্ষে দেখেছেন আর হিংসার বিরুদ্ধে তার কলম গর্জে উঠেছে বার বার। প্রতিবাদী অগ্নিপিণ্ডের মত আছড়ে পড়েছে একের পর এক প্রতিবাদী কবিতা। প্রার্থী, হে মহাজীবন, একটি মোরগের কাহিনী, দুরাশার মৃত্যু, ছাড়পত্র প্রভিতি লেখনিতে তার ছাপ আমরা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাই।
.
বুর্জোয়া শ্রেণী তখন যেমন ছিল এখনও তেমন ভাবেই বিদ্যমান। রাজনৈতিক দলের মতো তাদেরও রঙ বদলেছে মাত্র। আজ ২০১৫ সালে পঁচে যাওয়া এক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা কি তার গন্ধ পাইনা? নাকি প্রতিবাদের ভাষা আমরা একটু একটু করে ভুলতে বসেছি? নাকি আধুনিকতার ঠেলায় বড় বড় ফ্ল্যাট বাড়ির আড়ালে জঞ্জালের স্তুপের মত অন্ধকার বস্তি গুলোকে আর নজরে পরে না? কবি সুকান্ত হয়ত গন্ধটা পেয়েছিলেন। আর ক্রমশ ঘনিভুত হতে থাকা অন্ধকার তার নজরে পড়েছিল। সেই জন্যই হয়ত একফালি আলোর খোঁজ করছিলেন। নইলে কেন বলবেন-
.
হে সুর্য!
তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও,
আর উত্তাপ দিও,
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
.
হে সূর্য
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও
শুনেছি, তুমি এক জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড,
তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে
পরিণত হব!
তারপর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা,
তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী।।
.
আমরা ক্রমশ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাচ্ছি। অথবা স্বার্থান্বেষী হয়ে নিজের স্বপ্ন নিয়ে এতটাই মজগুল হয়ে পড়েছি যে ভুলে যাচ্ছি ছেড়া কাঁথায় শুয়েও স্বপ্ন দেখা যায়। সুকান্ত কিন্তু অন্য স্বপ্ন দেখতেন। শোষণ বিহীন এক নতুন বিশ্বের স্বপ্ন। এক প্রতিবাদী জনতার বিশ্ব। যেখানে একটা শিশু জন্ম মুহুর্ত থেকে প্রতিবাদ জানাবে-
.
খর্বদেহ নিঃসহায়, তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্বোধ্য প্রতিজ্ঞায়।
.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা তেতাল্লিশের মম্বন্তরের রেশ এখন আর নেই। এখন যা রেয়েছে তা চোখে দেখা যায় না। আমার বোনের ছিড়ে খাওয়া লাশ যেদিন এঁদো গলিতে পড়ে থাকবে সেদিন সমস্যা নজরে পড়বে। নইলে প্রতিদিন সকালে গরম চায়ের সাথে দৈনিক সংবাদ পত্রের পাতা উল্টাব আর খুন, ধর্ষণ আর শাসক দলের বেফাঁস মন্তব্য আয়েশ করে গিলব।
.
আজকের দিনে প্রতিবাদ করতে সেখাটা ভীষণ ভাবে দরকার। দরকার একজন কবি সুকান্তের। দরকার একটা গর্জে উঠা প্রতিবাদী কলমের। আর কবিতার স্নিগ্ধতা নয়, চাই কঠিন কঠোর গদ্য।
.
আমি রাজনীতি বুঝিনা, বুঝতে চাইও না। তবে যখন এক থালা ভাতের জন্য আমার পেট খিদেতে চোঁচোঁ করে, তখন তার যন্ত্রণা ভীষণ ভাবে অনুভব করি। ওই অট্টালিকা নয়, এক থালা ভাত আর একটু সম্মানের সন্ধান করি প্রতিনিয়ত। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দুর্গাপুজোর ধুমধাম করে ভোট হয়। আমরা সেজেগুজে ভোট দিতে যাই। শাসক দলের রঙ বদলায়। কিন্তু আমি আমার সম্মানের সন্ধান পাইনা। “গরীবের সম্মান” কথাটিই এখন সোনার পাথরবাটি।
.
আমার সম্পদ বলতে ভাঙাচোরা এই শরীর। আর গায়ের রং? লাল নয়, গেরুয়া নয়, সবুজও নয়; সেরফ রোদে পুড়ে কালো। কালো রঙের কোন ব্র্যান্ড ভ্যালু নেই। তাই আমার গুরুত্ব কেউ দেয় না। তবুও আমি কালোকেই ভালোবাসি।
.
আমার পেটে এখন এক শতাব্দীর খিদে। পুর্নিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি ছাড়া কিছু নয়। না, আমি রঙ বদলাতে রাজি নই। কেউকি আমায় একটুকরো রুটি এনে দিতে পারো?
শেষের কবিতার (বিপ্লব বেসরা) পুস্তক পর্যালোচনা ~
উত্তরপুরুষ
লেখক: তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক: আনন্দ প্রকাশনী
দাম: ১৫০
"তার বাবার দরকার নেই। মায়ের দরকার নেই। জাত-কূল-গোত্র-ধর্ম কিছুর দরকার নেই। কারণ সে জানে তার অন্য কোনও পরিচয়ের কোনও মানে নেই। তার একটাই পরিচয় সে বাংলা ভাষায় কথা বলে।"
গল্পের শেষের এই উক্তিটাই গোটা গল্পের সারমর্ম হিসেবে ধরে নিলে ভুল হয় না। এই উপন্যাস যেন ভেতো বাঙ্গালীকে একটু নাড়িয়ে দেওয়ার উপাখ্যান,তাকে তার জাত্যাভিমান আর সংস্কৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার গল্প। বাঙ্গালীদের এক সময়ের সাংস্কৃতিক উপনিবেশ বলে পরিচিত বেনারস,যেখানে এখন বাংলা ঐতিহ্য অস্তিত্বের সংকটে টালমাটাল,সেখানে এক পিতা-পূত্রের সেই সংকটকে জয় করার লড়াই,শুধু তাকে টিকিয়ে রাখায় নয়,তাকে সগৌরবে তার পুরোনো সিংহাসনে ফিরিয়ে আনার লড়াই। আর তার সাথে রয়েছে বেনারসের এক প্রচন্ডভাবে জলজ্যান্ত এক বর্ণনা,যা শুধু নিছক বর্ণনার জন্য বর্ণনা নয়,তাতে রয়েছে সেখানকার ঐতিহ্য,সেখানকার সংস্কৃতির এক অপূর্ব চিত্রাঙ্কণ। ঘাটের পাশে শতানিক,বীশ্বেশ্বর আর স্বাতীর সংলাপ গুলো পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যেন তাদের পাশে বয়ে চলা হাওয়া টা আমাকেও ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে!! এবং খুব সুন্দর লেগেছে তমালদার উপস্থাপনাও। আলাদা করে কোনো চরিত্রায়নের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়নি,সেভাবে বলতে গেলে বেনারস আর বাংলাভাষার প্রতি আবেগটাই হল এই গল্পের মূল চরিত্র। কিন্তু খুব যত্ন ভাবে প্রতিটি চরিত্রের প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাদের মুখের expression,তাদের পোশাক-আশাক এর বর্ণনা করা হয়েছে যা এই গল্পের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ন মনে হয়েছে। তমালদার এটা একটা নিজস্ব ধরণ গল্প বলার,চরিত্র গুলোর আপাদমস্তক বিবরণই অনেক সময় পাঠকের মনে সেই বিশেষ পরিস্থিতির গুরুত্বটা অনেকটাই পরিষ্কার করে তোলে। গল্পের সংলাপগুলো অবশ্য মাঝেমধ্যে একটু বেশিই রাশভারী মনে হয়েছে। দুটো মানুষের মধ্যে প্রথম প্রথম আলাপ হলে সকলেই একটু দ্বিধাগ্রস্থ থাকে যেটা সময়ের সাথে সাথে ভালো সম্পর্ক তৈরী হওয়ার সাথে কেটে যায় এবং তাদের কথাবার্তাও তখন অনেকটা হাল্কা হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে লেখক সেই ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠার আভাষ দিলেও তাদের কথোপকথন টা কে সেই ভাবে হাল্কা দেখাননি,সেই প্রথম আলাপের মতই ভারীক্কি ধরণের formal মনে হল। এই খামতি টুকু বাদ দিলে "উত্তরপুরুষ অবশ্যই একটা "must read" বই। আমরা শুধু ভাষা আন্দোলনেরই কথা শুনেছি বা পড়েছি,কিন্তু ভাষা নিয়ে এ হেন অনুভূতির নিদর্শনও অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি করে রাখা ভালো। এই গল্পকে তাই আমি ১০ এর মধ্যে দিলাম ৮.৫........
পুনশ্চ: সত্যি প্রেম কত নিষ্ঠুর,নারীসঙ্গের লোভ কত বিচিত্র। আপাত দৃষ্টিতে একে অপরকে চরম শ্রদ্ধা করা বন্ধু অথচ কত সহজেই এক বন্ধু তার এক বন্ধুকে "অপদার্থ" "practically hopeless" বলে দিল কোনো রকমের কোনো অনুকম্পা ছাড়াই। অবশ্য গল্পের প্রেক্ষাপটের দিক থেকে এর বিশেষ তাৎপর্য মনে হল না এবং গল্পের এই অংশটা না থাকলেও বিশেষ কিছু অসুবিধে হত না। তার বদলে গল্পের এক জায়গায় হটাৎ করে এক প্রতিষ্ঠিত উদার চরিত্রের এই রকম একটা cynical(এবং কিছুটা arrogant ও) মন্তব্য একটু বেখাপ্পা লাগল......
ব্যার্থতার জন্য
- অভিজিত রায় চৌধুরী
তুই হলি সংসারী নারী। সংসার তোর জীবন
আমি হলাম বাউল ফকির, আমার বেয়াক্কেলে মন
তুই বুকের ভেতর পাথর চাপিয়ে আবার রাঁধতে যাস
আর অন্ধকারে রাতের গভিরে, শরীর চিবিয়ে খাস
আমার কাছে সবই মায়া, মায়াতে জড়ান তুই
তাই মায়া-র জরান বালিশ নিয়ে, প্রতি রাত্রে শুই
আবার কক্ষন সবকিছু ভুলে রাতদিন করি পান
আমি অন্ধকারে রাতের গভিরে, খেপা বাউলের গান।
তোর কাছে আমি। বোমা ফেলবার নাগাসাকি হিরোশিমা
বাউল মনে সংসারি হলি, তোর হয়েছে জীবন বিমা
তবু বোমাফেলে তোর তীক্ষ্ণতা, আজ দিনের শেষে সুক্ষ
আর অন্ধকারে রাতের গভিরে, পাগলীর মনের দুঃখ....
অনীশ ভৌমিকের পুস্তক পর্যালোচনা:-
পুস্তক:“মায়াকাচ”
লেখক: তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক: আনন্দ প্রকাশনী
দাম:১৫০/- (ইং ২০১২,)
মফস্বলের অন্তর্মুখী ও ভাবুক তরুণ কৃষ্ণেন্দু আশৈশব তার কাকাদাদু তপনকান্তির সাহচর্য্যলাভ করায় তাঁর দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। আদর্শবাদী ও একসময়ের নরমপন্থী সাম্যবাদী আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য অববিবাহিত তপনকান্তি নিজের অনমনীয় ধ্যান-ধারণার কারণে অচিরেই হয়ে উঠেছিলেন “সম্পৃক্ত দ্রবণে ভাসমান অদ্রাব্য বস্তুর মতো” পারিবারিক-জীবনে নিতান্তই প্রান্তিক এক সদস্য। সামাজিক উপেক্ষার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কৃষ্ণেন্দুর মধ্যেই তাই তপনকান্তি নিজের অচরিতার্থ ইচ্ছেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সবার অলক্ষ্যে কিছুটা স্বেচ্ছাচারীর ঢঙে বপন করে দিয়েছিলেন এক তথাকথিত অচল ও বাস্তব-সাপেক্ষে অনুপযোগী জীবনবোধ। এদিকে স্বভাবগতভাবেই গতানুগতিকতার প্রবল বিরোধী হয়ে ওঠা কৃষ্ণেন্দু সাহিত্যের ছাত্র হবার পর থেকেই যেতে চায় সংখ্যাগরিষ্ঠের সহজ সাবলীল জীবনযাপনের বিপরীতে , পদে পদে নিজের ভুলভ্রান্তি-পরবর্তী আত্মসমীক্ষা ও আত্মকরুণার পৌনঃপুনিকতা সত্ত্বেও সে ‘শিল্পকলা’ নামক সময়োত্তীর্ণার সাধনার উচ্চাকাঙ্খায় অন্যমনস্ক । নিজের অপ্রচলিত চিন্তাভাবনার দৃঢ়তায় বরাবরের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক স্তরে ক্রমশই যখন ছাত্রছাত্রীমহলে কৃষ্ণেন্দুর ভাবমূর্তি হয়ে উঠছে নিতান্তই ‘এক সৌজন্যহীন, অহঙ্কারী ও আত্মকেন্দ্রিক যুবক’ হিসেবে, তখনই সে অযাচিতভাবে সান্নিধ্য পায় মিশুকে সহপাঠিনী নন্দিনীর। চেহারায় বিন্দুমাত্র দৃষ্টি-নান্দনিকতাহীন নন্দিনীর শুভাকাঙ্খা ও শর্তহীন মানসিক সমর্থন পেয়ে কৃষ্ণেন্দুর একাকিত্বে জর্জরিত, সঙ্গলিপ্সু অহম্ চরম তৃপ্তিতে স্ফীত হয়ে উঠলেও , প্রতিনিয়ত তাকে করতে হয় ইন্দ্রিয়-দাসত্ব থেকে মুক্তির মানবিক সাধনা। পারিবারিক অশান্তির অভিঘাত, আসন্ন পরীক্ষায় নিজের প্রস্তুতিহীনতার উপলব্ধি এবং নিজের অসহায়তাজনিত প্রবল হতাশায় ক্রমাগত বিপর্যস্ত কৃষ্ণেন্দুর শারীরবৃত্তীয় দর্শনক্রিয়ার যান্ত্রিকতার কাছে বশ্যতা স্বীকার না করে, দৃশ্যপটের প্রতিবিম্বকে মস্তিস্ক-সঞ্জাত হবার আগেই কোনো কল্পনা-প্রসূত ‘মায়াবী কাঁচ’ দিয়ে তাকে কাঙ্খিত রূপদান করার এক অলীক ও হঠকারী প্রচেষ্টার পরিণাম কি ধ্বংসাত্বক হতে পারে—তারই এক অসাধারণ ও মোহময় আখ্যান রয়েছে এই উপন্যাসে।
“ঘাতক”-নামক আরেকটি ‘আধুনিক পরিবর্তনশীল মনস্তত্ব’-বিষয়ক অনুপম উপন্যাস দিয়েই লেখকের সৃষ্টির সাথে আমার প্রথম পরিচয়। কিন্তু, ‘মায়াকাচ’ পড়ার পর এ কথা বলতে পারি যে অনবদ্য পরিবেশনশৈলী ও অত্যুত্কৃষ্ট শব্দবন্ধন সহকারে যেরকম সযত্নে এই সুখপাঠ্য কাহিনীটির অবতারণা করা হয়েছে – তাতে পাঠকের মানসপটে এক দীর্ঘস্থায়ী মুগ্ধতাক্ষেপণে লেখক স্বয়ং যেন এবার এক ‘ঘাতক’-এর ভূমিকায়!
শ্রোতা-
আমাদের সংসারে আমরা সবাই বেশ ভালো বক্তা তবে
কেউ কারোর কথা শুনিনা
শ্রোতা শুধু মা
আমরা যে যার কথা গড় গড় করে মা-কে বলে যাই , মা নির্বিবাদে শুনে যায় ...
বাবার নেশা চা পাতাতে
"কই গো শুনছো " বলে বাবা শুনিয়ে যায় কোন চা পাতার কি বিশেষত্ব , পাতা চা ভালো না দানা চা , আসাম চা-এ গ্যাস -অম্বল বেশি হয় নাকি দার্জিলিং চা- এ , কোনটা কতটাকা কিলো এই সব আর কি
মা শুনে যায় নিঃশব্দে
কাকার কারবার ওষুধ নিয়ে
কোন প্রোডাক্ট বাজারে একবার খাওয়াতে পারলে লাভে লাল হওয়া যাবে , কোন ওষুধ খাবার তো চুনোপুঁটি নাড়িভুড়ি পর্যন্ত হজম করিয়ে দেবে , কিসে কমবে কোলেস্টেরল , বাতের ব্যথা ইত্যাদি ইত্যাদি...
শুনতে শুনতে মা-র বয়স বেড়ে যায়
ঠাম্মার ধ্যান জ্ঞান ঠাকুর দেবতা, বলেন ... মেজ বউ , ঘুম থেকে উঠেই হরিনাম জপবে , আর ভুলেও যেন আয়না দেখোনা ... কলঙ্ক হয় ... আর হনুমান চালিসা , লক্ষ্মীর পাঁচালী খানা আরেকটু সুরেলা করে পোড়ো
কাপড় গুছোতে গুছোতে,বিছানার চাদরের কুঁচকে যাওয়া জায়গাটা ঠিক করে দিতে দিতে মা শুনে যায়
তারপর সন্ধ্যে বেলা আমি মাকে কবিতা নিয়ে কি ভাবছি বোঝাতে শুরু করি ... বলে যাই কবিতা ব্যাপারটা ঠিক কতটা অপ্রত্যাশিত , কতটা আলো আঁধারী ..
একের পর এক শুনিয়ে যাই সুনীল,শক্তি,জীবনানন্দ ...
তরকারী কুটতে কুটতে,উল বুনতে বুনতে মা শোনে , মুখে ভেসে থাকে একটা কবিতার মতই রহস্যময়ী হাসি ..
বাবার চা পাতা, কাকার ওষুধ , ঠাম্মার ঠাকুর-দেবতা আর আমার কবিতার কম্বো প্যাক-এর তলায় চাপা পড়তে পড়তে, মা-র না বলা কথা গুলো জীবাশ্ম হয়ে যায় ...
আমি সেই কল্পিত জীবাশ্ম থেকে একটা বিষন্ন প্রজাপতির মত দীর্ঘশ্বাসের ছাপ খুঁজে নিই
তারপর সেই মৃত ডানায় ভর দিয়ে
স্বার্থপরের মত
কবিতা লিখতে চাই ...
২৫.০৬.২০১৫
একটি নতুন বিষয়ের অবতারণা করতে চেষ্টা করলাম, যদি সকলের মনোগ্রাহী হয়ে ওঠে তাহলে ভবিষ্যতে এরকম সাক্ষাত্কার আরও তুলে আনার চেষ্টা করব। একটু সারপ্রাইজ দেবার জন্যেই আগে এ নিয়ে কিছু বলিনি বা অ্যাডমিনদের সাথেও আলোচনা করিনি (অরিন্দমদার সাথে অবশ্য কথা হয়েছিল)। কারো স্তাবকতা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, সঠিকভাবে পাঠকের সাথে লেখক/ লেখিকার পরিচয় ঘটানোই আমাদের লক্ষ্য।
আজকের অতিথি নবীন সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষাল।
বইপোকাঃ নমস্কার বিনোদদা, প্রথমেই বইপোকার তরফে আপনাকে স্বাগতম জানাই।
বিনোদ ঘোষালঃ আপনাকে এবং বইপোকার সকল সদস্যকে আমার নমস্কার।
বইপোকাঃ আপনাকে অনেক অভিনন্দন জানাই ‘প্রাণের পরে’ উপন্যাসটির জন্য। আনন্দবাজার পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় লিখতে পারার একটা আলাদা ঐতিহ্য থাকেই। আপনি কি বলবেন?
বিনোদ ঘোষালঃ হ্যাঁ কথাটা অবশ্যই খাঁটি সত্যি কথা। আনন্দবাজার পত্রিকার একটি সুদীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রচারের দিক থেকেও এই পত্রিকা অন্যান্যদের থেকে এগিয়ে। সুতরাং একজন তরুন লেখক হিসেবে ঐ পত্রিকায় লেখার সুযোগ পাওয়াটা একটা বড় প্রাপ্তি সন্দেহ নেই। আমি বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছতে পেরেছি এই পত্রিকার মাধ্যমে।
বইপোকাঃ আচ্ছা এই যে ‘প্রাণের পরে’ উপন্যাসের পটভূমি, এতো একেবারে এই সময়ের বলা যায়। মানে আমরা ফেসবুকে মগ্ন থাকি, সেখানে সম্পর্ক ভাঙে গড়ে; আমাদের সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ যারা পরস্পরের সাথে নানা বিষয়ে তর্কে যুযুধান হয় কিন্তু তারাই আবার কারো নিন্দা করার জন্যে মুহূর্তের মধ্যে এক হয়ে যায়, এসব তো খুব দৈনন্দিন ঘটনা। আপনি যখন এরকম বিষয়বস্তু নিয়ে লিখবেন ভাবলেন এটা কি ভেবেছিলেন যে সস্তার বিষয় না হয়ে যায়?
বিনোদ ঘোষালঃ সোসাল সাইট আসবার পর আমাদের জীবন এখন অনেকটাই ভারচুয়াল। আমি এই প্রজন্মের লেখক। সুতরাং আমাকে এই সময়ের কথা কিছু লিখতে গেলে অবধারিতভাবে মোবাইলফোন কিংবা ফেসবুকের কাছে কখনও আসতেই হবে, তাকে অগ্রাহ্য করতে পারি না। এখন ফেসবুক খারাপ না ভালো সেই বিতর্ক অন্য, কিন্তু বিষয়টি এই মুহূর্তে অমোঘ সেটাই বড় কথা। আর দৈনন্দিন ঘটনা নিয়ে লেখার কথা বলতে গেলে বলতে পারি যে কোনও সাহিত্যই আসলে কোনও জীবনের রোজনামচাই বটে। এবার তাকে আমি কীভাবে দেখলাম বা তাকে কীভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিলাম সেটাই দেখার। ঢোঁড়াই চরিত মানসে কিন্তু সতীনাথ ঢোঁড়াইয়ের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ঘোটে যাওয়া কথাকেই বলেছেন, কিন্তু তা এমনই অসামান্য হয়ে উঠেছে যা আজও আমাদের মুগ্ধ করে। আসলে কোনও শিল্পই তো আকাশ থেকে আচমকা পড়ে না, শিল্পীকে তার পারিপার্শ্বিক দৈনন্দিন জীবন থেকেই শিল্পের রসদ খুঁজে নিতে হয়। এর মধ্যেই মণিমক্তো ছড়ানো রয়েছে। এবার যে যতবেশি সেইগুলি তুলে আনতে পারেন সেগুলিই সেরা কাজ হয়। তাই সস্তা বা দামিটা বিচার হয় অন্যভাবে। শিল্পী বা লেখকের দেখার-প্রকাশের গুনে।
বইপোকাঃ নতুন জেনারেশনের অনেকে বলছে আপনার সৃষ্টি চরিত্রে নাকি নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে!
বিনোদ ঘোষালঃ আমি আমার লেখায় সেটাই চেষ্টা করি। আর আমার পাঠকরা যদি সত্যিই নিজেকে খুঁজে পান তা আমার কাছে অবশ্যই আনন্দের।
বইপোকাঃ এই উপন্যাসে নূপুর একটি ভারী অদ্ভুত চরিত্র, যে বয়সে বেশ ছোট একটি ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন বুনছে, শারীরিক চাহিদার টানেও বটে। এধরনের মেয়েদের বিদেশে Cougar বলে, কিন্তু এদেশে এই চল কম। এই সাহসী ঘটনা তুলে আনার প্রেক্ষাপট?
বিনোদ ঘোষালঃ নূপুর চরিত্র আন্তর্জাতিক। সারা পৃথিবীতেই এমন রয়েছে। আমাদের পাড়াতে এমনকি আপনাদের পাড়াতেও রয়েছে নিশ্চয়ই। এমনকি সে হয়তো আমাদের অতি পরিচিত কিংবা পরম আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেও কেউ হতে পারেন। এটা সত্যি। আর একজন লেখকের কাজ হল সত্যি কথা বলা। আর সত্যি কথা বলতে সাহস তো অবশ্যই লাগে। আমার সাহস দেখানোর জায়গা লেখা। তাই দেখাই।
বইপোকাঃ একদম পাঠকের মনের কিছু প্রশ্ন করতে পারি কি?
বিনোদ ঘোষালঃ নিশ্চিন্তে।
বইপোকাঃ আপনার লেখা কি পেশা? নাকি অন্য কোনও পেশায় আপনি যুক্ত?
বিনোদ ঘোষালঃ এই গত পরশু দিনেও আকাশবাণী থেকে আমাকে একটি সাক্ষাত্কারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তরুন প্রজন্মের যদি কেউ লেখাকে পেশা করতে চান তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কী বলবেন? আমি বলেছিলাম, বাংলা ভাষায় লেখাকে পেশা করতে গেলে আজও অন্তত সাড়ে আঠেরোবার ভেবে নেওয়া দরকার যে আমি অনিশ্চিতকালের জন্য হাফপেট খেয়ে চুড়ান্ত আর্থিক অনিশ্চিয়তা নিয়ে লড়াই করে যেতে পারব কি না। যদি মনে হয় পারব তাহলেই লেখাকে পেশা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। অন্যথায় এটিকে মূল্পেশার পাশাপাশি রাখাই ভাল। সমারসেট মম বলেছিলেন, হয় আপনি হোল টাইম লেখক, কিংবা আপনি লেখকই নন’। কিন্তু আমাদের বাংলায় আজও ভালো অনুবাদক নেই। পাঠকের পাঠ অভ্যাস আগের থেকে কমেছে। সুতরাং একজন লেখকের লড়াইটা কিন্তু ভয়ংকর। আমি একজন কমার্স গ্র্যাজুয়েট।দীর্ঘ দশ বছর এ্যাকাউন্টসে চাকরি করেছি। তারপর যখন বুঝেছি যে আমার দ্বারা একজন ভালো এ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়া এই জীবনে সম্ভব নয় তখন ছেড়ে দিয়ে একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বিভাগে যোগদান করি। এখন আমাদের কাগজের জন্যও লিখি, নিজের লেখাও লিখি।
বইপোকাঃ ‘প্রাণের পরে’ কি আপনার প্রথম উপন্যাস?
বিনোদ ঘোষালঃ না, আমার প্রথম উপন্যাস মাঝরাস্তায় কয়েকজন। সেটা ২০০৬সালে লিখেছিলাম।
বইপোকাঃ জুন মাসের ‘শিলাদিত্য’ পত্রিকায় আপনার একটি ছোট গল্প ছাপা হয়। ‘শ্মশান, দিদি আর একটি বেশ্যা’। এটি পড়ে কেউ কেউ বলেছেন দুর্দান্ত, কেউ বলছেন সন্দীপনের পরে এত স্পষ্ট ভাবে সমাজের কথা তুলে ধরার মত কাউকে লিখতে দেখা যাচ্ছে, অনেকে ভাইয়ের চরিত্রকে ঘৃণা করেছেন মন থেকে। এরকম একটি দুঃসাহসী সাইকোপ্যাথকে নিয়ে এলেন কীভাবে?
বিনোদ ঘোষালঃ আজ থেকে বছর দশেক আগে আমি যখন লেখালেখি শুরু করি তখন আমি মোটেও সচেতন ছিলাম না যে আমি কেন লিখছি আর কী লিখতে চাই। এত বছর ধরে ঘসতে ঘসতে এখন নিজের কাছে মোটামুটি একটা দর্শন তৈরি হয়েছে।অনেকে বলেন যে আমি অন্ধকারের গল্প লিখি। আমার লেখায় আলো নেই, শুধুই কালো। সত্যি বলতে আমি এই কথাকে অস্বীকার করি না। আমি কালো গল্পই বেশি লিখি। ইংরিজিতে যাকে ব্ল্যাক স্টোরি বলে। আমাদের বাংলাতেও জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, মতি নন্দী থেকে শুরু করে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং এই সময়ের নবারুন ভট্টাচার্য অসংখ্য এই ধরণের গল্প উপন্যাস লিখেছেন। এবং আমি একবাক্যে তাদের লেখার দ্বারা অনুপ্রানীত। সব লেখক নরম নরম আলো দেখালে কালোগুলো কে দেখাবে? ঘরে আলো জ্বালানোর জন্য যেমন ইলেক্ট্রিশিয়ান লাগে তেমনি বাড়ির পিছনে সেফটি ট্যাঙ্কে জমে ওঠা পাঁকগুলোকে সরানোরও তো লোক প্রয়োজন হয়। শিলাদিত্য পত্রিকার গল্পটি তেমনই এক অন্ধকারের গল্প। সত্যি বলছি এই লেখাটা লেখার সময়ে আমি এককটা মহূর্তে হাউ হাউ করে কেঁদেছি। এত নির্মমতা আমি নিজেও সহ্য করতে পারিনি। কিন্তু থামতেও পারিনি। একটা ঘোরের মধ্যে একটানা লিখে শেষ করেছিলাম। ভেবেছিলাম গল্পটা প্রকাশ পেলে আমার পাঠকেরা ঘৃনায় নাক কুঁচকে ফেলবে। আমাকে তুমুল গালাগাল করবে। কিন্তু অবাক হয়ে গেলাম এই গল্পটার জন্য আমি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠকদের তুমুল প্রশংসা পেয়েছি এবং আজও পাচ্ছি। এই গল্পের মুগ্ধপাঠকের মধ্যে যেমন বর্ষীয়ান নাট্যকার চন্দন সেন রয়েছেন তেমনই অগনিত তরুন প্রজন্মের পাঠকও রয়েছে। আমি শিলাদিত্য পত্রিকাকে অবশ্যই ধন্যবাদ জানাবো এই গল্পটি প্রকাশের সাহস দেখানোর জন্য। আরও একটা কথা বাংলায় সিরিয়াস পাঠকের সংখ্যা বিন্দুমাত্র কমেনি তার প্রমাণ পেয়েছি আমি এই গল্পের প্রতিক্রিয়া থেকে। খুব উত্সাহ পেয়েছি।
বইপোকাঃ আপনি কি জানেন আপনার ছোট গল্প আর গল্প পড়েই অনেক ফ্যান হয়ে গেছে আপনার লেখার?
বিনোদ ঘোষালঃ ২০১১ সালে আমার প্রথম গল্প গ্রন্থ ডানাওয়ালা মানুষ সাহিত্য একাদেমি যুব পুরস্কার পায়। বাংলায় ওই বইটিই প্রথম ওই পুরস্কার পেয়েছিল। এবং ২০১৪ সালে আমার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ নতুন গল্প ২৫ পশ্চিমবঙ্গ একাদেমির সোমেন চন্দ স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছে। দুটো পুরস্কারের উল্লেখ আগ বাড়িয়ে এই কারনে করলাম যে পাঠক আমার ছোটগল্পকে ভালোবাসছে, পছন্দ করছে। একজন লেখকের কাছে এর থেকে আনন্দের আর কীই বা হতে পারে।
বইপোকাঃ অনেক নতুন লেখক মিডিয়া হাউসের ভারে নিজের লেখার ধার না থাকা সত্ত্বেও নাম কিনছেন। আপনি কি এই মন্ত্রে বিশ্বাস করেন?
বিনোদ ঘোষালঃ একজন দার্শনিক, আমার এই মহূর্তে তাঁর নামটা মনে পড়ছে না, বলেছিলেন- একবিংশ শতাব্দিতে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই অন্তত কয়েক মিনিটের জন্য সেলেব হয়ে উঠবেন মিডিয়ার দৌলতে। কথার আইডিয়াটা কিন্তু খুব ভুল নয়। তবে কয়েক মিনিটের জন্য সেলেব হয়ে ওঠাটা কোনও কাজের কাজ নয়, অন্তত শিল্পের জন্য তো নয়ই। জনপ্রিয়তা কখনই শিল্পের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। মিডিয়া সকলকেই ঘুরে ফিরে হাইপ দেয়। এটা তার কাজ। এবার যার কোয়ালিটি রয়েছে তিনি টিকে যান বাকিরা হারিয়ে যায়।
বইপোকাঃ ‘প্রাণের পরে’ উপন্যাসে আপনি নানা জায়গায় নানা বইয়ের কথা এনেছেন, আমরা কি ধরে নিতে পারি আপনি নিজে একজন বইপোকা?
বিনোদ ঘোষালঃ হ্যাঁ। না পড়লে লিখব কী করে? সব আইডিয়া তো আর জীবন থেকে আসে না। বই থেকেও আসে। সুতরাং পড়তে তো হয়ই। নির্বিচারে পড়ি।
বইপোকাঃ প্রিয় লেখক?
বিনোদ ঘোষালঃ অনেকেই রয়েছেন তবে যাদের গুরু বলে মানি তাদের মধ্যে সদত হসন মান্টো,
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, আল মামুদ, মতি নন্দী।
বইপোকাঃ প্রিয় বই?
বিনোদ ঘোষালঃ বই আমার কাছে একটি প্রিয় শব্দ।
বইপোকাঃ বই নিয়ে থাকা কোন অবসেশন?
বিনোদ ঘোষালঃ রাত্রে ঘুমোনোর সময় আমার বাঁ পাশে বউ থাকে আর বালিশের নিচে কোনও একটা বই।
বইপোকাঃ লিখতে বসে লেখার ফ্লো না এলে কি করেন?
বিনোদ ঘোষালঃ ফেসবুক করি। ফোনে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করি। সিনেমা দেখি।
বইপোকাঃ পাঠক এবং নতুন লেখকদের কোনও পরামর্শ দিতে চাইবেন?
বিনোদ ঘোষালঃ পাঠকদের আর কী পরামর্শ দেব! শুধু বলব নতুনদের বইও কিনে দেখুন। আর নতুন লেখকদের বলব নিজের লেখাটা লিখে যাও। নিজের গলায় নিজের স্বরই মানায়, তাহলেই লোকে শুনবে। আমি যদি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্টাইলে কথা বলতে যাই তাহলে লোকে হাসবে। আর যা বিশ্বাস কর তাই লেখো। অবিশ্বাস থেকে লেখা আসে না।
বইপোকাঃ এখন কি লিখছেন?
বিনোদ ঘোষালঃ পূজো সংখ্যার জন্য গল্প।
বইপোকাঃ ‘বইপোকা’র মত গ্রুপ নিয়ে কি বলবেন? এখন অনেক সাহিত্যপ্রেমী, লেখক, লেখিকারাও সমীহ করেন এই গ্রুপকে। এই যুগে বেশি বই কেউ পড়েনা এই অপবাদের দেওয়াল কি ‘বইপোকা’ ভাঙছে মনে করেন?
বিনোদ ঘোষালঃ যারা সোসালসাইটের শুধু নিন্দে করেন তাদের এটাও দেখা উচিত যে বইপোকার (https://www.facebook.com/groups/boipoka.writers/) মতো গ্রুপে বইপ্রেমি তরুন ছেলেমেয়েরা কতকিছু করছে। কতকিছু ভাবছে। এবং তারা সোজাসাপটা কথা চড়া গলায় বলে দিতে পারে। ভন্ডামো করে না। এমন গ্রুপ আরও তৈরি হোক।
বইপোকাঃ আপনার সাথে কিছু মুহূর্ত ভাগ করে নিতে পেরে ভালো লাগছে খুব, কামনা করি নতুন লেখাগুলিও সাফল্যের মুখ দেখুক। ভালো থাকুন,ধন্যবাদ।
----------------------------------------------------------
এই সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন আমাদের সদস্য অভীক মুখার্জ্জী
সুচরিতা দত্তর পুস্তক পর্যালোচনা :-
পুস্তক: ২৪ নম্বর শ্যামানন্দ রোড
লেখক: সবুজ মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক: উনজন
দাম:১০০


বড় বোকা বোকা ছিল সেই দিনগুলো.... সেই 'জলছবি, রংমশাল, স্কুলছুটির হজমিরা, রূপকথার পায়রাদের' দিনগুলো .. সেই ভাড়া বাড়ির পাড়ায় সব ছেলেমেয়েরা মিলে সারাদুপুর হুটোপুটি করে খেলে বেড়ানোর দিনগুলো, সেই সাদাকালো টিভির দিনগুলো, সেই বাড়িতে প্রথম টেলিফোন আসার দিনগুলো, কিন্তু বড় মিঠে ছিল যে সেসব.. মিষ্টি ভালোলাগার আলগা চাদর জড়ানো সে সব দিনের অস্তিত্ব এখন শুধুই আমাদের মনের মনিকোঠায়.. সত্যি কত তাড়াহুড়োয় কেটে গেল না দিনগুলো!!!!!!!!! মাঝে কটা বছর কেটেছে? ২০ টা... বড়জোর ২২ টা বছর.. এর মধ্যেই আমাদের চিরপরিচিত সাঁতসাঁত-এ সোঁদা গন্ধের দেয়াল, সরু অন্ধকার সিড়ি, দেয়ালের ফাঁক-ফোকরে যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা 'বট- অশথ' গাছ সব জি+3 = বহুতল + একক পরিবার এর ফর্মুলায় হারিয়ে গেল.. হয়ত বিশ্বায়ন দায়ী, হয়ত বা আমরা বড্ড তাড়াতাড়ি গ্লোবাল হয়ে গেলাম.. অবধারিতভাবেই যার প্রথম কোপ পড়ল সাবেকি বাড়িগুলোর উপর.. আজ কলকাতার সর্বত্রই 'গ্লোবাল' কলকাতার 'কসমোপলিটান' সংস্কৃতির ধ্বজাধারী বহুতল এর ভিড়.. আজ আমরা 'লন্ডন' হচ্ছি.. অদূর ভবিষ্যত এ হয়ত সিঙ্গাপুর বা টোকিও-মেক্সিকো হব.. এত হচ্ছি- হবর ভিড়ে কোথায় হারিয়ে গেল প্রাসাদ নগরীর সেই নোনা ধরা সাবেকি ঘরবাড়িগুলো ? কেমন ছিল 'প্লেন লিভিং' চিন্তাধারার অধিকারী সেই সব বাড়ির বাসিন্দা মধ্যবিত্ত সমাজ? মাত্র দু'দশক এর ব্যবধানেই যারা 'সেকাল' হয়ে গেল ? এর সদুরত্তর মিলবে সবুজ মুখোপাধ্যায় এর '২৪ নম্বর শ্যামানন্দ রোড' এ.. চিরপরিচিত চেনা শব্দের লেখনীতে বইটি যেন এক লিখিত নস্টালজিয়া-যা ফিরিয়ে নিয়ে যায় আমাদের ছোটবেলায় .... ধন্যবাদ রাজা পোদ্দার কে অসাধারণ এই বইটি প্রকাশ করার জন্য.. আর অনেক অনেক ধন্যবাদ লেখক সবুজ মুখোপাধ্যায় কে এরম এক নস্টালজিয়া আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য... বইটির দ্বিতীয় খন্ডের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম... যেসব বইপোকা এখনো পড়েননি বইটি, তাদের বলব দেরী করবেন না এই নস্টালজিয়ার সঙ্গী হতে .
এই বইটি পাওয়া যাবে :
সাউথ - স্টাডি -যাদবপুর (কফি হাউস), কল্যাণ দা'স ষ্টল (রাসবিহারী মরে); সেন্ট্রাল - দে বুক স্তরে , দে'স পাবলিকেশন , বৈচিত্র .ধ্যান্বিন্দু (কলেজ স্ট্রিট) পাতাবাহার (কলেজ স্ট্রিট),
নর্থ - এন্টারপ্রাইস (ইনসাইড সিন্থী মোড় মার্কেট),