Sunday, 21 June 2015

ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না ~ অভীক মুখার্জী

ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না ~ অভীক মুখার্জী 
-----------------------------------
ফেব্রুয়ারির হাওয়া জানান দিচ্ছে গরম আসতে খুব দেরি আর নেই; নরেশের দোকানের শিঙাড়ায় ফুলকপি কমে যাবে, কাঁচের শিশিতে জমে যাওয়া নারকোল তেল আর গলিয়ে মাখতে হবে না, ছোট জলাগুলো শুকোতে থাকবে; ঐ যে বললাম, গরম আসতে খুব দেরি আর নেই।
আমার আকাশ – বাতাস চমকানো ঈশ্বর – পৃথিবী – ভালবাসা মাথায় নিয়ে কৃষ্ণরামপুর বাজার থেকে হেঁটে যাচ্ছি বদরতলার দিকে, চোখে পড়ল একটা চেনা চেনা মানুষ। মানুষটা চেনা নাকি বলা মুশকিল হলফ করে, চেনা হলে তো একবারেই চিনে ফেলতাম; অচেনাও নয় তাহলে চিনতে চেষ্টাই করত না আমার ক্ষুদ্র মস্তিস্ক।
উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা একটা অবয়বকে খুব দ্রুত মাথার ভিতরে সার্চ করে বেরাচ্ছি, যাতে চিনে নিয়ে কিছু একটা বলতে পারি, কারণ চোখের সামনে দেখছি যিনি আসছেন আমার উলটো দিক থেকে তিনি আমার দিকে স্মিত হাস্য পাত করেই আছেন।
এই আমার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, এতেই আমি আস্থা রাখি, ঐ বয়সের কেউ আমার স্যার না হলেও স্যার বলে ডাকতে কাউকেই দোষ হয় না, স্যার মানে মহাশয়, মানে স্যার ডাকে সবাইকেই সইয়ে দেওয়া যায়।
-স্যার ভাল আছেন?
-চিনতে পারলে তবে?
-হ্যাঁ স্যার, আপনাকে চিনব না! সেকি কথা!
-না, এখন আমি অনেককে চিনতে পারি না তো, বয়স হয়ে গিয়ে নার্ভগুলো আর কাজ করে না। ঐ যে অলফ্যাকটরি নার্ভের কি একটা প্রবলেম বলেছিল সচিন ডাক্তার... মমমমম... মনে পড়ছে না।
মনে পড়ে গেছে ততক্ষণে আমার, রবিন বাবু, রবিন হালদার, আমাদের, মানে আমার মাধ্যমিকের টিউশনের বিজ্ঞান টিচার, রবিন বাবু। সামান্য একটা অলফ্যাকটরি নার্ভের উল্লেখ আমাকে মনে করিয়ে দিল বিজ্ঞান স্যারের কথা, নাহলে মনেই করতে পারছিলাম না। যেন এক দশকে পেরিয়ে গেছেন অর্ধ শতক। সেই চোখের দীপ্তি, মুখের লালিমা, প্রশস্ত বপু সব কালের কপোলে নোনা জলের ধারার মত হারিয়ে গেছে; ঘোলাটে চোখ, তামাটে মুখ, কোলকুঁজো দেহ নিয়ে রবিন স্যারের সেই পুরানো ছবি ইতিহাসের মত লাগল আমার মনের কোনও এক কোঠায়। যেমন কুষাণ সম্রাট কনিস্কের স্কন্ধ কাটা মূর্তির ছবি দেখেছি জীবন মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস বইতে, ঠিক তেমনি আমার বিজ্ঞান স্যার দাঁড়িয়ে আমার সামনে।
- এইরে একটা ভুল করে ফেলেছি মনে হচ্ছে, অলফ্যাকটরি নার্ভের কথা বললাম কিনা! ওটা বোধ হয় ঘ্রাণের কাজে লাগে, মনে নেই কিসে মনে থাকার কাজ হয়। মনে পড়ছে না। তোমার নামটাও মনে পড়ছে না, কিছু মনে কর না, খুব চেনা লাগল তোমাকে তাই দাঁড় করিয়ে দিলাম আর কি। নামটা যেন কী.... মমমম....অরিন্দম?
- না স্যার আমি মৃদুল; ২০০৫ সালের মাধ্যমিক ব্যাচ। মনে পড়ছে?
- না এখন তেমন মনে পড়ে না। অনেককেই চিনতে পারি না বললাম যে, অনেকে আমাকেও চিনতে পারে না।
দেখছ তো কি হাল আমার। আমি তো স্কুলের মাস্টার নই যে পেনসন মিলবে! টিউশন করতে পারি না এখন, ঐ যে কিচ্ছু মনে থাকে না, পড়াব কি! ভুল হয়ে যাচ্ছিল, ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলতে হলে নেতা হতে হত, কোনও স্যার কি তার ছাত্র – ছাত্রীর নেতা হতে পারে নাকি?
এখন সবাই আমাকে দেখলে ভয় পায়, সরে যায়, কথা বলে না, যদি আমি ধার চাই।
বুঝলাম রবিন স্যার এখন সমাজে ব্রাত্য।
- তা তোমাকে তো অনেকদিন দেখিনি, থাকো কোথায়?
- চাকরি করি স্যার। মুর্শিদাবাদে থাকি। ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট।
- তাই নাকি! এটা জানতাম না তো!
বলতে গেলাম, ‘সেকি স্যার সবাই তো জানে’। পারলাম না, থামতে বাধ্য হলাম, টের পেলাম আমি এমন কিছু হাতি ঘোড়া বশ মানাইনি যে তার জন্য আমাকে এক ডাকে চিনতে হবে।
- তা ভালো। মুর্শিদাবাদ ভালো জায়গা। ঐতিহাসিক স্থান। আমি বিজ্ঞান পড়াতাম বটে, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে প্রচুর পড়তাম। এখন আর পড়ি না, মনে রাখতে পারি না। তা ঘুরে দেখলে বাচ্ছাওয়ালি কামান, সিরাজের খাবার প্লেট, আজিমুন্নেসার কবর? দেখলে... দেখলে....মমমম....?
ইতিহাস নিয়ে ব্যস্ত আমার বিজ্ঞান স্যারকে ফিরতি উত্তরে বলব কেমন করে যে আমার ঐসবে উত্সাহ নেই। ভাবছি যে কেনই দেখা হল, একটা খ্যাপাটে লোক রাস্তায় বেশ উত্তেজিত ভাবে আমাকে প্রশ্ন করছে দেখে অনেক চেনা অচেনা মানুষ দেখছে।
- না স্যার দেখা হয়নি, দেখে নেব, সময় হলেই দেখে নেব।আসলে কাজের খুব চাপ জানেন তো। ছুটির দিনে গিয়ে দেখে নেব।
বিশ্বাস করুন আমি অমন জ্বলন্ত অথচ করুণ দৃষ্টি কোনও দিন দেখিনি। এক পাত্রে আগুন আর জল দুটো সহাবস্থান করানো সম্ভব হলে যেমন দেখাত ঠিক তেমনি লাগল স্যারের চোখ।
- তুমি জানো কি, History has no holiday? তেমনি জেনে রাখো, ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না।
রবিন স্যার আর দাঁড়ালেন না, অসীম বিরক্তি, অদ্ভুত রাগ নিয়ে জায়গা ছেড়ে হাঁটা দিলেন।
আমি কিঞ্চিত স্তম্ভিত, হতভম্ব।
স্থাণুবৎ দণ্ডায়মান আমি। পাশের ওল্ড বেনারস রোড ধরে ছুটে যাচ্ছে ধর্মতলা – গড়েরঘাট রুটের বাস, মহীনের চায়ের দোকানে টুংটাং শব্দের জিগির তুলে কাঁচের গেলাসে চিনির বিয়ে গরম জলের সাথে, অনুপম রায় গাইছে 98.3 FM Radio তে, ‘বসন্ত এসে গেছে...’।
মাথায় একটা কথাই ভাসছে, ‘ছুটিতে ইতিহাস তৈরি হয় না’।

Saturday, 20 June 2015

পুস্তক পর্যালোচনা~ সোহম দাস:-

সোহম দাসের পুস্তক পর্যালোচনাঃ-
নাম : কিশোর রচনাসংগ্রহ
লেখক : মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়
প্রকাশকঃ আনন্দ পাবলিশার্স
পরিসংখ্যানবিদ ও অর্থনীতিবিদ মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র । রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের লেখকদের মধ্যে অন্যতম মোহনলাল কিশোর-সাহিত্যে তাঁর মুন্সিয়ানা দেখিয়েছিলেন নিপুণভাবে । তাঁর কিশোর-কাহিনীগুলি শুধু কিশোর নয়, যুবা, প্রবীণদেরও যে মন ভালো করে দেবে সেটা এই বইটি একবার পড়লেই বোঝা যাবে । “বোর্ডিং স্কুল” ও “বাবুইয়ের অ্যাডভেঞ্চার” উপন্যাস দুটি এক কথায় অসাধারণ । দুটি উপন্যাসেরই নায়ক দুটি কিশোর । তাদের চোখ দিয়ে দেখানো তাদের খুদে জগতটাকে তিনি যেভাবে দেখিয়েছেন, তাতে লেখক হিসেবে তিনি কতখানি দক্ষ তার পরিচয় তিনি দিয়েছেন । “বোর্ডিং স্কুল”-এর নবাগত ছাত্রটি অন্যান্য ছাত্র-শিক্ষকদের কাছে যেমন পরিহাসের পাত্র হয়ে ওঠে তেমন অনেকেই তাকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে কাছে টেনে নেয় । কিন্তু অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাসে সেইসব আপনজনেরা তাকে ছেড়ে চলে যায় কোনও না কোনও ভাবে । ভালো-খারাপের দোলাচলে অতিবাহিত হতে থাকে তার স্কুলজীবন । পড়লে পাঠকের চোখে জল আসতে বাধ্য । “বাবুইয়ের অ্যাডভেঞ্চার” আবার অনেকটাই অন্যরকম । বলা যেতে পারে, অনেকটাই অনুপ্রেরণামূলক । কিশোর বাবুই “আজবতত্ত্ব” নামের এক কিশোর-পত্রিকায় দেশ বিদেশের নানা অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী পড়ে উদ্বুদ্ধ হত এবং সে নিজেই তার মত করে অ্যাডভেঞ্চারে বেড়িয়ে পড়ত । সেগুলি পড়লে হয়তো পাগলামো মনে হবে কিন্তু এটাই তো কৈশোর । এই পাগলামো না থাকলে আর কৈশোরের মজা কোথায় । কিন্তু বাবুই পরবর্তীকালে সত্যি সত্যিই এক দুর্ধর্ষ অ্যাডভেঞ্চার করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের হয়ে । যুদ্ধবিমান চালিয়ে সে জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে বোমাবর্ষণ করত । তারপর অবশ্য ধরা পড়ে যায় । তারপর যুদ্ধ শেষ হলে সে একজন মুক্ত ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে ব্যবসা শুরু করে ও শেষে দেশে ফিরে আসে । তাও সে তার ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ভুলতে পারে না । আজবতত্ত্ব কোলে নিয়ে ছাদের কোণে বসে পড়ে বিভোর হয়ে যাওয়ার দিনগুলো । এছাড়া এই সংকলনে ২৯টি নানা স্বাদের গল্প, ১৭টি মজার গল্প, দুটি নাটিকা, ৪টি বড়গল্প, ২টি ভূতের গল্প, ১৪টি রূপকথা, স্মৃতিকথা ইত্যাদি স্থান পেয়েছে । রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা “কত্তাবাবা” আর লেখক-শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে “বড় দাদামশাইয়ের কথা” ঠাকুরবাড়ির শিল্প-সংস্কৃতির কথা যেমন বলে তেমন পারস্পরিক হৃদ্যতার কথাও সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন তাছাড়া উঠে এসেছে নানা অজানা তথ্যও । যতই ভারী ভারী গম্ভীর বই পড়ি না কেন, মাঝে মাঝে স্বাদ বদলের জন্য এরকম বইয়ের খুব প্রয়োজন আছে, একেবারে মন ভালো করে দেওয়া বই । তাই কিনতেই পারেন আনন্দ পাবলিশার্সের এই অনবদ্য সংকলন । দাম মাত্র ১৭৫ টাকা ।

|| অপরাহ্ন || ~ স্পর্শের বাইরে

                      



আমি সাধারণত সামাজিক,অভিজ্ঞতালব্ধ গল্প লেখার চেষ্টা করি। কাল রাতে অলৌকিক গল্প লিখতে গিয়ে দেখলাম,, ব্যাপারটা বেশ কঠিন !
|| অপরাহ্ন ||
_______________

আমার ডাক নাম শর্মি। তবে ও আমাকে 'সু' বলে ডাকতো।
কি সুন্দর এক অক্ষরের মিষ্টি নাম না ! মাঝে মাঝে ও যখন আমাকে সু বলে ডাকতো,তখন মনে হত এর থেকে ভাল এক অক্ষরের নাম হয়ত পৃথিবীতে আর একটাও নেই।
আমি যখন পার্কে বা রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতাম,তখন ও পেছন থেকে এসে হঠাত করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরতো। কোন তরুনীকে যদি হঠাত তার প্রেমিক ভালোবেসে চুপিচুপি পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে ধরে,,তখন সে খুব তৃপ্তি পায়। ওর এই পাগলামিতে আমিও ভিষন খুশি হতাম। মনে মনে খিলখিল করে হেসে উঠতাম। কিন্তু ওকে বুঝতে দিতাম না। গম্ভীর গলায় বলতাম - "রাস্তাঘাটে এসব অসভ্যতা আমি পছন্দ করি না"।
ওর মুখটা যখন করুন হয়ে যেত,,আমি তখন হেসে হেসে ওর মাথার একঝাক চুল এলোমেলো করে দেবার চেষ্টা করতাম। কিন্তু সবসময় পারতাম না। ও খুব লম্বা ছিল।
বিকেলের এই সময়টা আমার খুব ভাল লাগে। সূর্য মাথা নুইয়ে নেয়,এদিকে অন্ধকারের ছিটেফোঁটাও থাকে না। এই সময়টাকে খুব সুন্দর ভাষায় কি যেন বলে?? অপরাহ্ন।
আচ্ছা আপনি কখনো ঠকেছেন?? ভালোবাসায় ঠকেছেন?? আপনার কাছের মানুষ'টা যার সাথে সারাটা জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন,,সে হঠাত করে আপনাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দূরে সরিয়ে দিয়েছে??? তখন ঠিক কিরকম অনুভব করেন???
ভিষন রেগে যান?
কান্নাকাটি করে সারাক্ষন নিরবে গাল ভিজিয়ে রাখেন?
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তার কথাগুলো মনে পড়ে আর ঘুম আসতে চায় না?
তার পুরোনো ছবি'গুলি নষ্ট করেও স্মৃতির আয়নায় বারবার সাজিয়ে রাখেন?
তাকে অন্য কারও জীবনে জড়িয়ে পড়তে দেখে মনে মনে দির্ঘনিশ্বাস ফেলেন বলেন,,'আমি আজও তোমায় ভালোবাসি'?
আর তারপর বুক দাপড়িয়ে নিজেকে সান্তনা দিয়ে বলেন,,'এখনও অনেকদিন পড়ে আছে'?
তারপর একসময় স্মৃতিপট গুলো মনের খুব গভিরে ধামাচাপা দিয়ে ভব্যিষতের জন্য প্রস্তুতি নেন?
এর মধ্যে কোনটা? যেটাই হোক,আপনি নিজেও জানেন না এই পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের থেকে আপনি অনেক ভালো আছেন। অনেক সুখে আছেন।
আজ বিকেলে আমার এই ছোট্ট এককামড়ার ঘর'টায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাত করে খাটের কোনায় এই ডায়েরি'টা চোখে পড়লো। আমি ক্লাস ১২ অবধি পড়েছি। লেখাপড়া জানি। তাই ডায়েরি পৃষ্টা উল্টিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করলো। আমি কোনোদিনও সেভাবে কিছু লিখিনি,তাই আমার কাছে ইচ্ছাটা খুব লজ্জার। ঠিক যেমন ১৪ বছরের কিশোর ঠোটের উপর কালো রেখার অস্তিত্ব দেখে লজ্জা অনুভব করে।
আমি খুব দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। আমরা ৫ বোন। কোন ভাই নেই যে ভবিষ্যতে বাবার শিরদাঁড়া'র অবলম্বন হয়ে উঠবে। বাবা হাড়-ভাঙা খাটুনি খেটে আমাদের মানুষ করেছে।
আমি তখন আমার জীবনের প্রথম প্রেমে পড়ার আনন্দে মশগুল। ছেলেটাকে প্রথম দেখায় কিভাবে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম জানিনা।
একদিন হঠাত বাড়ি থেকে পালাম। যদিও পালানোর কোন প্রয়োজন ছিল না। বাবা-মা'র ঘাড় থেকে একটা মেয়ে নেমে গেল ভেবে হয়ত এমনিই ছেড়ে দিত। তবুও 'ও' বললো হঠাত করে বিয়ে সেরে ফেলতে।
যাকে মন থেকে বিশ্বাস করে ভালোবাসা যায়,তার হাতে হাত রেখে মৃত্যুকে পর্যন্ত আপন করে নেওয়া যায়। সেই জায়গা থেকে পালানো'টা তো সামান্য কিছু।
আমার ভেজা ঠোটের দিকে তাকিয়ে 'ও'র চোখ দুটো যখন ঝিকমিক করে উঠতো,তখন নিজেকে এই পৃথিবীর সবথেকে সুখি নারী বলে মনে হত।
জীবনের প্রথম চুম্বন কেউ ভোলেনা।
আমার আজও একটু একটু মনে পড়ে। ও'র সেই শরীরের ঘ্রান,উদ্দিপনা,ঘামে ভেজা চকচকে সুঠাম দেহ আমাকে মাতাল করে তুলতো। মাঝেমাঝে এই পুরুষ'টা একমাত্র আমার ভেবে নিজেকে কি ভিষন সৌভাগ্যবতী মনে হত!
দুজনে মিলে একদিন ঠিক করলাম,,একদিন স্বামী স্ত্রী হয়ে বাড়িতে গিয়ে বাবা-মা'র কাছে ক্ষমা চাইবো। তিন বোনের জন্য চুড়িদার,বড়'দি আর মায়ের জন্য দুটো ভাল তাঁতের শাড়ি,,,আর বাবার জন্য একটা নতুন দামী টেপরেকর্ডার কিনে নিয়ে যাব।
আমার বাবা খুব ভালো গান গাইতে পারে। সব তার নিজস্ব গান।
ছোটবেলায় আমরা ৫ বোন জেগে থাকতাম। রাতে খাওয়ার পর কখন বাবা কাঁঠাল গাছের তলায় শোয়ানো ভাঙা চৌকিটায় বসে গান ধরবে।
বাবা'র কোন গানের কথা মনে না থাকলেও সুর'গুলি আজও আমার মনে আছে। সুর লেখার উপায় জানা থাকলে আপনাদের লিখে শোনাতাম।
নতুন টেপরেকর্ডারের একটা সখ বাবা'র অনেকদিনের। যেটায় বাবা নিজের গান'গুলি ধরে রাখতে পারবে। আমাদের প্রত্যেকদিনের খাবারের চাহিদা'র কাছে সেই সখ কোনদিনও অম্লান হতে পারেনি।
ও যখন দীঘা'য় হানিমুনের কথা বললো তখন মন'টা আনন্দে মেতে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল,আমি এত সুখি কেন? দীঘা'য় আসার আগে দুজনে মিলে কেনাকেটা করতে বেড়িয়েছিলাম। মনে আছে সেদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। ও ভালোবেসে আমাকে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি কিনে দিয়েছিল। জিনিস'টার দাম সামান্য হলেও মনে হয়েছিল,এর থেলে মূল্যবান কোন উপহার কি এই পৃথিবী'তে আর একটাও হতে পারে!! বাদবাকি কেনাকাটা দীঘা'র জন্য রেখে দিয়েছিলাম,ঠিক যেমন ভালোবাসা'টুকু তুলে রেখেছিলাম সমুদ্রের ঢেউ এর জন্য।
ওর দেওয়া সেই লাল শাড়ি পরেই আমি জীবনে প্রথম ধর্ষিত হই।
হঠাত একদিন নিজেকে আবিষ্কার করি এই এককামড়ার ঘরে। ভালোবাসার আনন্দ প্রথম নথ ভাঙার প্রচন্ড কষ্টের কাছে হার মেনেছিল। দু'পা ভেষে গিয়েছিল রক্তে।
প্রথমে অনেক চিতকার করে বাইরের জগতের কাছে নিজের অস্তিত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। দু'দিন পরে বুঝলাম আমি নরকে এসে পড়েছি। এখানকার জগত বিষাক্ত ভালোবাসায় ভর্তি।
আমাকে সবসময় দরজা বন্ধ করে রাখা হত। এখনও হয়। আমি প্রচন্ড ভয়ে গুমরে থাকতাম। প্রথম প্রথম দরজা খোলার চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি। পরে নিজেই ভয়ে থাকতাম যেন এই ঘরের দরজা কখনো না খোলে,,কারন দরজা খোলার সাথে সাথেই এক একজন করে উন্মত্ত,হিংশ্র পশু এই ঘরে ঢুকতো। ওরাও 'পুরুষ' এবং 'মানুষ' শ্রেনীর মধ্যে পড়ে। আমি অনেক ক্ষুদার্ত হায়েনা'র সামনে একদলা মাংশপিন্ড হয়ে উঠলাম।
যে ভালোবাসার জন্য একসময় ঘর ছেড়েছিলাম,,তারপর থেকে সেই ভালোবাসার ভয়েই এ ঘরে আটকা পড়ে রইলাম।
প্রথম দু'মাস দুরন্ত কষ্টের পরে একসময় যেন নিজের থেকেই মানিয়ে নিলাম। গলার থেকে নিচের অংশের কোন গুরুত্ব আমার কাছে রইল না। আমি তখনও বুঝিনি আমি এ ঘরে কিভাবে এলাম।
আমার এ ঘরে একটা জানালা ছিল। জং ধরা লোহা'র শক্ত জানালা। নাজানি কতদিন খোলা হয়নি। বহুদিনের প্রচন্ড চেষ্টার পর একদিন সেই জানালা খুললাম। আমার ঘরে প্রায় তিন'মাস পরে সূর্যের আলো এসে পড়লো। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম আমার ঘর'টা দোতলায়। নিচে কতো কতো মেয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হায়েনা'দের সাথে দর কষাকষি করছে। আমি বুঝতে পারলাম,আমি কোথায় এসে পড়েছি। আরও দু'দিন পর বুঝতে পারলাম,আমাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই পৃথিবীতে সবজায়গায় একটা নির্দিষ্ট বাজার থাকে,,যেখানে নারী'রা বিক্রি হয়,, পুরুষ'রা কিছু সময়ের জন্য কেনে,সভ্যতা...সভ্যতার মত এগিয়ে যায় আমাদের মত কিছু কিছু মানুষ'কে অসভ্য তকমা'য় ভূষিত করে।
জানালা থেকে সেদিন ওকে দেখেছিলাম। আমার সেই প্রানের পুরুষ। সেই একমাথা ঝাঁকানো চুল নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে বয়স্ক একজন মহিলা'র সাথে কথা বলছে।
হঠাতই আমার সাথে ওর চোখাচোখি হল। ও কিছুটা ঘাবরে গেল। মুখটা থতমত হয়ে গেল। আমার দিকে আর না তাঁকিয়ে তাড়াতাড়ি অন্যদিকে চলে গেল। ঠিক যেন পালিয়ে গেল।
কিজানি কেন ও'র ওপর আমার বিন্দুমাত্র রাগ হলো না। অথচ সেটাই হবার কথা ছিল। ইচ্ছা করছিল ওর থতমত করুন মুখের উপরের সেই একঝাক চুল ঘেঁটে এলোমেলো করে দি। কিন্তু পারতাম কি? ও যে ভিষন লম্বা!
কিন্তু রাগ আমার হলো। হলো কিছুদিন পর। ও'কে আমি ভিষন ভালোবেসে ছিলাম। ও আমাকে প্রত্যাক্ষান করতে পারতো। নাজানিয়ে অজ্ঞানবস্থায় এই বেশ্যালয়ে বিক্রি কেন করে দিল?? কত টাকা পেয়েছিল তাতে 'ও'? আমার ভালোবাসাস মূল্য দিয়ে সেই দাম মাপা গেলে,,,একবার মেপে দেখতাম।
আমি সারাদিন এই ঘরে খাটের উপর শুয়ে থাকতাম। এখনও থাকি। পশুগুলো যখন আমার দেহের উপর উন্মত্ত হয়ে উঠত,আমি উপরে ঘুরন্ত ফ্যান'টার দিকে একদৃষ্টে তাঁকিয়ে থাকতাম। ফ্যান'টা ঘুরতে ঘুরতে একসময় যেন হলুদ হয়ে যেত। কাঁদতে কাঁদতে একসময় যেমন মানুষের চোখের জল অজান্তে হলুদ হয়ে ওঠে। ফ্যান'টা সারাদিন ঘুরতো। যেন হাওয়া দিয়ে আমার সব বেদনা,কষ্ট উড়িয়ে নিতে চাইছে। ফ্যান'টাকে আমি ভালোবেসে ফেললাম।
একদিন জানালা'র শিঁক ভেঙে একটা চাকু'র মত বানালাম। তারপর জিনিস'টাকে খাটের পায়া'র একটা গর্তে লুকিয়ে রাখলাম।
যদি কখনো আমার সেই প্রানের পুরুষ আমার এই ঘরে আসে,ওর একঝাক চুলের মধ্যে ওটা পুঁতে দিয়ে বোঝাবো,,ওর মতো আমিও ভালোবাসতে পারি।
হ্যাঁ একদিন 'ও' আসলো। একদিন বিকেল। বহুদিন পর। জানিনা হয়ত ভুল করেই আমার ঘরে ঢুকে গিয়েছিল। ওকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম,,,,ও অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে ইতস্তত করছিল।
আমি ওকে সে সুযোগ না দিয়ে আপন করে নিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম কেমন আছো?? বেঁচারা উত্তর দিতে পারেনি। হয়ত অবরাধ বোধে ভুগছিল।
ওকে কাছে টেনে নিয়ে আমরা আবার মিলিত হলাম।
একসময় ও যখন ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন,আমি ধীরে ধীরে খাঁট থেকে নামলাম। খাঁটের পায়ায় লুকিয়ে রাখা চাকু'টা বার করলাম। তারপর উঠে আসলাম উপরে। ওর একঝাক চুলের মধ্যে ওটা সজোরে আঘাত করতে প্রস্তুত হলাম।।
নাহ!! পারলাম না। আমি হেরে গেলাম। ভালোবাসার মানুষ যতই দুরে ঠেলে দিক না কেন! হয়ত তার উপর রাগ হয়,,,কিন্তু চেষ্টা করলেও তাঁকে কষ্ট দেওয়া যায় না। শুধু নিরব কিছু অভিমান বুঁকের ভিতরে আটকে থাকে,,যা সে কখনো ভাঙাতে আসে না।
লোহা'র চাকু'টা আবার আগের জায়গায় রেখে দিলাম।।
এখন আমি মাঝে মাঝে বাইরে বের হতে পারি। দিনের বেলা এরা বেড়াতে দেয় না। বিকেলের পর থেকে নিয়ম কিছুটা শিথিল হতে থাকে। বিকেলে যখন লাইন দিয়ে আমার বয়সী মেয়েগুলিকে রোজগারের আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি,তখন খুব মায়া হয়। আর রাতে যখন দেখি সারাদিনের রোজগারের টাকা দিয়ে বেশ আরাম করে, হাঁটু মুড়ে আসন করে বসে গ্রাস পাকিয়ে ধবধবে সাদা ভাত খাচ্ছে,তখন সেই দৃশ্যটাকে কোন অচেনা শিল্পির জল রঙে অাঁকা পৃথিবীর সবথেকে সুন্দরতম চিত্র বলে মনে হয়।
এক মিনিটটট!!
কে যেন আসছে। হ্যাঁ মনে হয় এই ঘরের দিকেই। হয়ত আবার এক উন্মত্ত পুরুষ আসছে মাংসের লোভে। প্রায়ই মনে হয় এদের বাড়িতেও আমার মতো দিদি,বোন বা মেয়ে আছে,,ওই দু'টি কালো চোখে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য এরা খুঁজে পায়না কেন??? এখন নিজেকে সত্যিকারের মানুষের থেকে ভূত বলে বেশি ভ্রম হয়।
আওয়াজ'টা প্রায় ঘরের সামনে এসে পড়েছে। আমাকে থামতে হবে..............
অনেকদিনের বন্ধ দরজা'টা হঠাত বিকট শব্দ করে খুলে গেল। তার ভিতরে ছুড়ে ফেলা হল এক উনিশ-কুড়ি বছরের মেয়েকে।
প্রচন্ড ঝড়ের পর গাছপালা'গুলোর যে অবস্থা হয়,তার সাথে এই মুহূর্তে মেয়েটার মুখের বেশ মিল পাওয়া যাচ্ছে। সাথে বেশ সুপুরুষ প্রায় ২৬-২৭ বছরের একটি যুবকও ঘরের ভিতরে ঢুকলো।
মেয়েটা কাকুতিমিনতি করছে.......
- প্লিজ আমাকে যেতে দাও। আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম,ভালোবেসেছিলাম। আমার সাথে এরকম কেন করছ?
- ভালো তো আমি এখনও তোমাকে বাসি সোনা। শুধু তোমার ওই ভালোবাসা'টুকু আরওও অনেকের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে।
- ছি:! লজ্জা করে না তোমার?
- লজ্জা আবার কি?? খায় না মাথায় দেয়। বেশি চাপ নিও না ডার্লিং। তোমার লজ্জা কমানোর দায়িত্ব আজ থেকে আমি নিলাম। আজ থেকে তোমার নাম রুমি নয়,,রঙ্গিলা। হে হে হে..........
- প্লিজ আমাকে যেতে দাও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। আমি ছাড়া আমার মা বাবা'র আর কেউ নেই।
- অবশ্যই যেতে দেব সোনা। এই মুহূর্তে তুমি ছাড়াও আমার আর কেউ নেই। দুবছর ওয়েট করো। টাকা'টুকু ভালোভাবে উসুল হোক। তোমার শরীরের দাম কত জান! অনেকেকেকক! তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমার তো ডার্লিং গর্ব হওয়া উচিত।
- শয়তান,,জানোয়ার,,ইতর! তুই কতদিন আটকে রাখবি? একদিন ঠিক বেড়াবো! তখন তোকে খুন করে নিজে মড়বো দেখে নিস!
- তাই নাকিইইইইই?? খুব সখ? বেড়ানোর কথা কল্পনাতেও এনো না। হাজার চিতকার করলেও এই ঘর থেকে কেউ বেড়াতে পারে না। এর আগে একজন ছিল। অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারেনি। শেষে উপরে ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। তবে ততদিনে মার্কেট ভ্যালু উসুল হয়ে গিয়েছিল। তারপর উপরের ওই ফ্যান'টাও খুলে নেওয়া হয়।
যা হোক,শেষবারের মত তোমাকে একটু ভোগ করে নি। কাছে এস রঙ্গিলা.......
মেয়েটা ছিটকে এসে যুবক'টার গালে একটা চড় মারল।
- তবে রে! এত বড় সাহস!.........
মেয়েটার পেটে এক লাথি মেরে খাঁটের পাশে মেঝের উপর শুইয়ে দেয় যুবক'টি। তারপর চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করে মেয়েটার প্রতি ক্রমশ হিংশ্র হয়ে উঠতে থাকে।
মেয়ে'টা নিজেকে বাঁচানোর প্রানপন চেষ্টা করে,কিন্তু বারবার বার্থ হয়। ততক্ষণে যুবক'টি মেয়েটির শরীরের উপর চড়ে বসেছে।
মেয়েটি ঠিক যে মুহূর্তে আস্তে আস্তে শিথিল হতে থাকে,,,তখনই তার কানে কে যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে 'পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'। প্রথমে মেয়েটি কিছু বুঝতে না পারলেও পরে আবার একই শব্দ ফিসফিস করে করে উচ্চারিত হতে থাকে... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'.... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও' ... পাশে,খাঁটের পায়ার ধারে হাত দাও'..
মেয়েটা পায়া'র ধারে হাত দিতেই হাতে শক্ত মতো কিছু বাঁধল। সেটা দিয়ে সজোরে যুবক'টির গলার ধারে আঘাত করলো।
জানালা'র শিঁক দিয়ে বানানো পুরোনো কিন্তু ধাঁরালো চাকু'টা যুবক'টিকে মুহূর্তের মধ্যে প্রানহীন করে দিল। তার গলা রক্তে লাল হয়ে উঠতেই মেয়েটা উপরের দেহ'টাকে ঠেলে সরিয়ে ঘরের চারিদিকে তাঁকাল। কোথাও কেউ নেই। একপাশে শূন্য খাঁট,,মরচে ধরা জানালা,দূরে কোথাও একটা খাতার মতো পড়ে আছে।
এই সময় কন্ঠ'টা আবার প্রতিধ্বনিত হল.....'পালাও'.............'পালাও'........'পালাও'..
মেয়েটা ভয়ে কুকরে আছে। দু'টো চোখে জোর করে পড়ানো কাজল উপচে জল নেমে সারা মুখ কালো কালো হয়ে উঠেছে। সে জানেনা এটাই তার শেষ সুযোগ। সে জানেনা তার পালানোর মধ্যে দিয়েই এই অপরাহ্ন'এ আরও একজনের মুক্তি ঘটতে চলেছে।
(শেষ)

Friday, 19 June 2015

-শুভ সূচনা-



  গুলো পড়ার ও মতামত জানানোর অনুরোধ জানাচ্ছি..সকলে ভালো থাকুন ও অনেক অনেক বই পড়ুন ও অন্যদের ও পড়ার উত্সাহ দিন.বইপোকা বন্ধুরা যারা বই ভালোবাসো ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করো তাদের জন্য আমাদের এই ব্লগ বইপোকা...দু বছর পূর্বে ফেসবুক এ আমরা তৈরী করেছিলাম আমাদের বইপোকা গ্রুপ (https://www.facebook.com/groups/boipoka.writers/). যা বর্তমানে বিশাল আকারে পরিনত হয়েছে..যেখানে আমরা সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি বিভিন্ন বইয়ের রিভিউ দিযে থাকি, লেখক ও বই নিয়ে আলোচনা ও পোস্ট হয়..আর কদিন পূর্বে আমরা ফেসবুক এ গঠন করি আর একটা গ্রুপ যার নাম বইপোকার কলম (https://www.facebook.com/groups/boipoka.2/).সেখানে আমরা বইপোকারা নিজেরা লেখা-লিখি করি.আর আজ আমরা এই ব্লগ তা বানালাম ফেসবুক দুনিয়া থেকে আমরা বেরিয়ে আরো বৃহত্তর বইপোকা দের কাছে পৌছে যাবার জন্য.এখানে আমরা রোজ বই নিয়ে নানান তথ্যসমৃদ্ধ পোস্ট দেব এবং আমাদের ফেসবুক গ্রুপের বইপোকা মেম্বের্স দের লেখা বৃহত্তর পাঠক দের কাছে পৌছে দেব আমাদের এই বইপোকা ব্লগ এর মাধ্যমে.সকল বইপোকা বন্ধুদের আমাদের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ জানাচি..এবং সকল বইপোকাদের রোজ আমাদের ব্লগ এ এসে পোস্ট
https://www.facebook.com/groups/boipoka.writers/
https://www.facebook.com/groups/boipoka.2/

Thursday, 18 June 2015

কালোসোনা-বজ্রদীপ সাহা

তখন পরন্ত বিকেল। আকাশে সবে সোনালী ছোপ ধরেছে। মশারা তাদের রাত্রি ব্যাপী অভিযানের মহড়ায় ব্যাস্ত। কালকের অকালবর্ষনের জলে মাটির উঁইপোকা গুলোর ডানা গজিয়ে ‘অভি’ তে রূপান্তরিত হয়েছে। তারা মাটি ফুরে একে একে উড়ান দিচ্ছে ‘অকাল মরণের’ দিকে।চারপাশের বাড়ি গুলো সব প্লট করে বানানো। দোতলা বাড়ি, উঠান আর এক খাবলা বাগান। সামনে ম্যাটাডোর যাওয়ার মতো রাস্তা, আর একটা বিশাল আকাশ।রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেল ভ্যান এসে থামল। ভ্যানের ওপর দুটো শিশু, একটির বয়স তিন কি চার অপর টি বোধহয় সাত-আট। সোনালী আলোতেও তাদের মুখ বিবর্ন, ততোধিক বিবর্ন তাদের পোষাক। তাদের চোখে স্বপ্ন নেই, নেই শৈশবের প্রানচ্ছল চাঞ্চল্য। বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়ে, সে সব কবেই চুরমার হয়ে গেছে।ঠ্যালার আরেক সাওয়ারি এক মধ্যবয়স্কা মহিলা। না মধ্যবয়স্কা বলা হয় তো ঠিক নয়, বয়স ৩৫ মতো। গায়ে একটি মলিন শাড়ি, আর সামান্য কিছু গয়না। তার কৃষ্ণবর্নের মুখখানা যেন পাথর কুঁদে বানানো। সেখানে হাসির আভাস টুকুও কোনদিন দেখা গেছে কিনা সন্ধেহ। চালকের পড়নে হলুদ প্যান্ট যা কোনকালে হয়তো সাদা ছিলো। তার দেহ শীর্নকায় হলেও পেশীবহুল। সারামুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। এই চারজন প্রানীছাড়াও দেখা যাচ্ছে একটি সাউন্ড বক্স, মাউথ পিস, মুরির প্যাকেট, আরো নানা হাজিবাজি জিনিশ।গাড়িখানা থামলে সাওয়ারিরা একে একে নামে যন্ত্রের মতো নিজের নিজের কাজ শুরু করলো। একে অপরের সাথে গল্পকরে সময় নষ্ট করার ‘বিলাশিতা’ এদের নেই। মহিলাটি একটা থালা আর দুটো কাঠি নিয়ে পথের মাঝে বসল। শীর্নকায় লোকটি ঝোলা থেকে একটা ঢোল জাতীয় বাদ্যযন্ত্র বার কাঠি গুলো খুজতে লাগলো।ছোট্ট শিশুটি ততোক্ষনে রাস্তায় নেমে পড়েছে, আর কৌতূহলী দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ধরা যাক তার নাম মুন্না। মুন্নার দাদা একটা ময়লা ছোপ ধরা টুপি মাথায় দিল। টুপির চুড়ার সাথে একটা ঢিল বাঁধা।মহিলা টি (সম্ভবত মুন্নার মা) কাঠি গুলো দিয়ে থালাটা বারি মারতে লাগলো। লোকটিও ঢোলে বোল তুলল। আর মুন্নার দাদা তার মাথাটা অদ্ভুত কায়দায় নাড়তে লাগলো। ফলে টুপির সাথে বাঁধা ঢিল খানা স্যাটালাইটের মতো মাথার চারপাশে বাঁই বাঁই করে পাক খাচ্ছে।এই হেন ড্রামাটিক্যাল শব্দের ধাক্কায় আমার ঘুমবাবাজি পলায়ন করিল। শব্দের উৎস সন্ধানে মেসের বাইরে এসে দেখি, সোনালী আকাশের নীচে সুন্দর সার্কাসের আয়জন।হ্যাঁ, সবার মতো আমার স্থুল দৃষ্টি তে তাইই ধরা পড়লো। একবারো নজরে এলো না তাদের শুকনো বিবর্ন মুখ গুলো।মনে মনে বললাম বাঃ ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য আদর্শ সাবজেক্ট। এফ.বি তে এর নিচে কি কোটেশান দাওয়া যায় তা ভাবতে ভাবতে রুমে এলাম।বাকি রুম মেট দুটো তখন শুয়ে শুয়ে আড্ডা মারছে। আমি চার্যার থেকে মোবাইলটা খুলতে খুলতে বললাম “কি কুড়ের মতো শুয়ে আছিস? বাইরে চ সার্কাস হচ্ছে সার্কাস...... আর শোন দরজা- জানলা ভালো ভাবে বন্ধ করে যাবি। এরা হয়তো সামনে খেলা দেখাচ্ছে। পিছন থেকে দেখবি সব মাল গাপ করে দিয়েছে!”বাইরে তখন মুন্নার বাবা দুটো এক্স বারে দড়ি খাটাতে ব্যাস্ত আর মুন্না, মুন্নার দাদা একটা শত ছিন্ন শতরঞ্চির ওপর ছোট খাটো যোগব্যায়াম গোছের কিছু দেখাচ্ছে। এখনো সিরিয়াল গুলো শুরু হয় নি। তাই কলোনি বাসি বিকেলের এই ‘মুফৎ এন্টারটেন্ট’ মিস করতে নারাজ। গোল করে বেশ ভিড় জমেছে। আমি একদম সামনে এসে মোবাইল খানা বাগিয়ে ধরি।এর পরে আরো কয়েকটা খেলা দেখানোর পর, মুন্নার দাদা এক্সবার টা ধরে উঠে পড়ল। তাতে টান টান করে টাঙান দড়ি, এর ওপর দিয়ে সে নানা ভাবে হেঁটে যাবে। বক্সে তখন ‘জিনা ইঁহা, মরনা ইঁহা’ গানটা একটা অদ্ভুত পরিবেশ শৃষ্টি করেছে।আমার হাতে তখন ভিডিও রেকর্ডিং চলছে।কিন্তু, একি.....। কিছুতেই খেলার দিকে মন দিতে পারছি না! বার বার চোখ চলে যাচ্ছে ওদের মুখ গুলোর দিকে। একটা যান্ত্রিক হাসি পর্যন্ত সেখানে নেই। অন্যদিকে যারা খেলা দেখছে তাদের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। একে পৈশাচিক ছাড়া আর কি বলা যায় আমি জানি না। চোখ মুখ গুলো যেন অহংকার দিয়ে গড়া। কিসের এত অহংকার? এরা বড়লোক ঘরে জন্মেছে বলে?এদিকে ছেলেটা যে দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে? নিচে পিচরাস্তার হাতছানি! অথচ, কারোর মুখে এতটুকুও আতঙ্ক বা চিন্তার রেখা নেই। সবাই মজা লুটছে।আমার মনে হোল যেন এক দেবশিশু যেন শরু একটা সাঁকো পার হচ্ছে, আর নিচে হাঁ করে বসে আছে নরখাদকের দল। তাদের দাঁতের ফাঁক দিয়ে ঝরে পরছে বিষাক্ত লালা। তারা রক্ত চাই, চাই নরমাংস।ইতিমধ্যে মুন্নার বাবা একটা থালা পেতে গেছে। সবাই সেখানে একটাকা, দশটাকা করে ফেলছে, ঠিক ডার্স্টবিনে ময়লা ফেলার মতো। আমিও পকেট থেকে দশটাকা বার করে রাখলাম।সাথে সাথে মনের ভিতর কি যেন একটা খোঁচা দিতে লাগলো। মন কে বুঝালাম এর বেশি আমি কিই বা করতে পারি? এখানে বেশি টাকাও নেই যে দুশোটাকা পড়ে আছে, তা বইমেলার জন্য আবশ্যক।আমাদের মেসের বাড়িওয়ালারা এতক্ষন ছাদ থেকে খেলা দেখছিল।‘অ্যাই তনি শোনো। এটা একটু ধরো তো।’আমার হাতে এসে পড়লো একটা প্যাকেট তাতে চারটে বিস্কুট।‘ওদের থালা তে রেখে দাও।’আচ্ছা আমরা বোধহয় কুকুরদের এভাবে খেতেদি, তাই না?আমি থালাতে প্যাকেট টা রাখলাম। আর সেই সাথে খোঁচাটা যেন দ্বিগুন হয়ে গেল। আর থাকতে পারলাম না। রুমের দিকে ছুটলাম। আমার রুমমেট দুটোও পেছন পেছন এলো।‘এই দরজা বন্ধ কর মশা ঢুখবে’‘দাঁড়া আমি যাবো।’‘টাকা বার করছিস? একশো টাকা দিয়ে কি খাবি?.....আরে খাবার তো আছে।’আমি উত্তর না দিয়ে বেড়িয়ে এলাম। সাথে ওরাও এলো।আকাশ তখন ফিকে হতে লেগেছে। মুন্না দের ভ্যান গোছগাছ করে রেডি। সেই থালাটার ওপর একশোটাকার নোটটা রাখলাম।সেলফে না হয় একটা বই কমি হোল। শুকনো জ্ঞানের থেকে, ওদের একটুকরো হাসি বেশি মূল্যবান নয় কি?আমি অবশ্য ওদের হাসি দেখার জন্য অপেক্ষা করি নি। দৌড়ে ঘরে এসছি। ভয় হয় হাসির বদলে, যদি দীর্ঘশ্বাস জোটে, ১০০ টাকায় এখন কিই বা হয়?অন্যদিকে তখন রুমমেটদের হাসির রোল উঠেছে।‘আজ সারাদিন আমরা তনি কে এন্টারটেন্ট করবো। তনি আমাদেরো দিতে হবে কিন্তু।’‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমি তোর অ্যাসিসটেন্ট’এরা আমার থেকে অনেক বড়লোক। অনেক বড়ঘরের ছেলে। এখানে এসেছে শুধুমাত্র ফুটানি করতে। এরা চাইলে ৫০০টাকাও অনায়াসে দিতে পারত।আমার গলায় কি একটা দলা পাকিয়ে উঠছে। বিরক্ত হয়ে বললাম ‘এতে এত হাসির কি আছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না!’তা করতে ওপর থেকে বাড়িওয়ালি নেমে এসেছে‘তনি.........। তুমি ওদের একশো টাকা দিয়েছ? এখানে বাইরে পড়তে এসেছ। আর.......।বাবা রে বাবা, কঠিন ছেলে! ওরা এমন কিছু খেলা দেখাই নি, যে একশো টাকা দিতে হবে। তার থেকে তোমার বন্ধুদের দিতে।আমি হাসি সার্কাসে ১০০টাকায় অনেক ভালো সিট পাওয়া যায়। তোমরা যদি জানতে কেন দিলাম, তাহলে হয় তো পৃথিবী টা আরো সুন্দর হোত।এর পরে ওপর থেকে সবাই একে একে এসে আমাকে একি কথা নানা ভাবে বলে গেলো। যেন আমার ভেতর কিছু গোলমাল আছে! আসল গোলমাল যে তোমাদের মধ্যে, তা কি তোমরা জানো না?একটু পরে মা ফোন করল।‘হ্যালো, খেয়েছিস কিছু?’‘হ্যাঁ, খাবো। শোন না একটা কথা বলবো। বলো কিছু বলবে না।’‘কি শুনি?’‘বলছি যে। ওই খেলা দেখাতে আসে না বেদ্গুলো।’‘হ্যাঁ।’‘আজ.....আমাদের মেসের সামনে এসছিলো খেলা দেখতে। তো আমি না ইয়ে মানে কি মনে হলো..... একশো টাকা দিয়ে ফেলেছি।’‘তোর কাছে আরো ১০০ ছিলো তো। দিলি না কেন?’ইয়েস, এখানেই আমার বাবা-মা। সব্বার থেকে আলাদা। বাবা ভদ্রলোক যে কতো জনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করেছে, আর কতো ছেলেমেয়ের বইপত্তের জোগাড় দিয়েছে তার কোন লেখাজোখা নেই। আই প্রাউড ফর দেম।_____________________________________________ওই ওপরে ঈশ্বর নাম ধারি কোন বেক্তি আদৌ আছেন কি না জানি না। যদি থেকেও থাকেন, আমার দৃহ বিশ্বাস, হয় তিনি বদ্ধ কালা, নয় কুম্ভকর্নেই সমগোত্রীয়। আমি কাজটা করেছিলাম শুধুমাত্র আমার বিবেক নামক বস্তুটিকে শান্ত করার জন্য। আমার মন যে কত খানি ছোট তার প্রমান, আমার ট্রাঙ্কে থেকে যাওয়া আরো একটা একশো টাকার নোট।বাইরে তখন আরো একটা সন্ধা নামছে। দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে একটা সাইকেল ভ্যান। তারা আসে অন্যদিগন্ত থেকে, আমাদের আনন্দ দিতে। আবার চলে যায়। আর সাথে, ‘পুরস্কার’ হিসাবে পাওয়া চারটে বিস্কুট।